আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ
তারা কেউ ফিরে আসেননি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ ২৫১ জন এখনো ফিরে আসেননি। গুম হওয়া এসব ব্যক্তি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন তা নিয়ে এখনো সন্দিহান স্বজনরা। তাদের ফেরার অপেক্ষায় অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রহর গুণছেন স্ত্রী-সন্তানরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের শিকার ব্যক্তিরা ফিরে আসবেন বা উদ্ধার করা হবে এমন আশায় ছিলেন অনেকের স্বজন। কিন্তু আজও উদ্ধার না হওয়ায় হতাশ তারা। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হবে। এবারের প্রতিপাদ্য হলো-‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাউ’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আজ রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে (আইবি) সমাবেশের আয়োজন করেছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্ট অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ হলো-‘গুম বা এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’। এটি মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন। ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত দিবসটির লক্ষ্য হলো-বিশ্বব্যাপী গুম ও জোরপূর্বক নিখোঁজের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করা এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা। এ কারণে শুধু আইন করে গুমের প্রতিকার সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন: শপথ নিলেন আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত বিচারপতি হাবিবুল গনি
গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি। স্ত্রী হাসিনা চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা আজও তার ফেরার অপেক্ষায় আছেন। হাসিনা চৌধুরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি এখনো অপেক্ষায় আছি-আমার স্বামী ফিরে আসবেন। আল্লাহ একদিন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন। আমার সন্তানরাও বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাসবে। আল্লাহ যেন এ দিনটি দেখার পর আমাকে মৃত্যু দেন। তার চার ছেলেমেয়ের সবাই বড় হয়েছে।
২০১০ সালের ২৫ জুন গুমের শিকার হন তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর (বর্তমান ঢাকা দক্ষিণের ২০) ওয়ার্ড কমিশনার বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এখনো তার খোঁজ মেলেনি। তিনি জীবিত আছেন নাকি মৃত, সেটিও জানেন না কেউ। এ ঘটনায় মামলা হলে থানা পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই তদন্ত করে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। প্রতিবেদনে তারাও গুমের বিষয়ে কিছুই জানতে পারেননি। চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে করা মামলা চলছে।
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ডে ১.২ শতাংশ ত্রুটি হয়েছে, দাবি অর্থমন্ত্রীর
চৌধুরী আলমের ছেলে শাহবাগ থানা বিএনপির নেতা আবু সাদাত সাওয়ান চৌধুরী বলেন, মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, এখনো সরকার ঘোষণা করেনি-তার বাবা আর বেঁচে নেই। তিনি বলেন, কে মানতে চাইবে যে তার বাবা নেই? আমরা তো তার অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে আছি।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনকালে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন (বর্তমানে বিলুপ্ত)। এর মধ্যে ২৫১ জন ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ। এর বাইরে ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ব্যক্তির অনেকেই তথাকথিত ‘ক্রসফায়ারের’ শিকার হয়েছেন বা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়েছিলেন।
সূত্র জানায়, ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসাবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার আমলে গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত শুরু হয়।
এদিকে আলোচিত গুমের ঘটনার মধ্যে রয়েছেন-বিএনপির প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী। গাড়িচালক আনসার আলীসহ তিনি ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানী থেকে গুম হন। আজও তার খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজের পর ইলিয়াস আলীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে তার পরিবার। এ বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করলেও কোনো হদিস মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে তদন্তের কথা বললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনাটি বাংলাদেশে গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অন্যতম বড় প্রতীক হিসাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে স্থান পায়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী যুগান্তরের কাছে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
১১ বছর বয়সি শিশু আরাফ হোসেন পৃথিবীর আলো দেখার কয়েক মাস আগে তার বাবা পারভেজ হোসেনকে একদল লোক রাজধানীর শাহবাগ থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। আরাফ এখন মাতুয়াইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। বাবার আদর, স্নেহ কেমন তা জানে না ছোট্ট শিশুটি। গুমের শিকার পারভেজ হোসেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে রাজধানীর ওয়ারী থানার যোগীনগর এলাকায় বোনের বাসায় থাকেন। পারভেজের স্ত্রী ফারজানা আক্তার যুগান্তরকে জানান, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দুপুরে শাহবাগ থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তিন সহযোগীসহ পারভেজকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে আর কোনো হদিস মেলেনি তাদের। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমসংক্রান্ত কমিশনে অভিযোগ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেন। হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ফারজানা বলেন, ৫ আগস্টের পর আশায় বুক বেঁধেছিলাম স্বামী ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো এলো না। আমি আজও তার ফেরার অপেক্ষায় আছি। আমার বিশ্বাস সে ফিরে আসবে।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে অপহৃত হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। সাদা পোশাকে একদল লোক তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারের দাবি অপহরণকারীরা কুদ্দুসুরের পূর্বপরিচিত। এ সময় কুদ্দুসুরের সঙ্গে থাকা ভাতিজা মোহাম্মদ সাজাহান অপহরণকারীদের চিনতেও পেরেছিলেন। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি তুলে নেওয়ার পর তিনি ফিরে আসেননি। বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও জানেন না স্বজনরা। ঘটনার পর পল্লবী থানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয় সদস্যের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন কুদ্দুসুর রহমানের স্ত্রী জোসনা বেগম। মামলাটি থানা পুলিশের পর পুলিশের বিশেষায়িত দুটি সংস্থা তদন্ত করেছে। কিন্তু কোনো হদিস মেলেনি তার। অভিযুক্তদের আইনের আওতায়ও আনা যায়নি। জোসনা বেগম যুগান্তরকে বলেন, আমার মন বলছে এখনো সে বেঁচে আছে। হয়তো একদিন ফিরে আসবে। আমি আমার স্বামীকে ফিরে পেতে চাই।
এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর ৩৮নং (বর্তমান ২৫) ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন। এরপর আর তার খোঁজ মেলেনি। তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন মায়ের ডাক-এর সমন্বয়কারী ও বর্তমানে এমপি সানজিদা ইসলাম তুলির ভাই।
গুম প্রতিরোধ দিবসের আয়োজন : শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬’ উদযাপনের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি দাবি করেন, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কোনো ধরনের গুম, খুন বা নির্যাতনে বিশ্বাস করে না। এ অনুষ্ঠানে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে যারা গুমের শিকার হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে শনিবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, গুমের অবসান ঘটাতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। গুমের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে অতীতের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গুমের অবসান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে সত্য উদ্ঘাটন এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইনের সুরক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে?ছে মানবাধিকার সংস্থাটি।





