লাখো শিশুর ‘হাহাকার’

Shahrier Islam Pallab
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ন, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৭:০৫ অপরাহ্ন, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
  •  বিলিয়ন ডলারের শিশুপণ্যের বাজার
  •  শিশুদের ঘিরে বাড়ছে পণ্য, ব্র্যান্ড ও ভোক্তা ব্যয়
  •  শিশুখাদ্যের বাজারেই হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
  •  জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বেবি কেয়ার পণ্যের বাজার
  •  পণ্যের প্রাচুর্যের বিপরীতে মৌলিক চাহিদার ঘাটতি
  •  গ্রাম ও শহরের শিশুর খাদ্য প্রাপ্তিতে স্পষ্ট বৈষম্য  

একদিকে কোনো শিশুর আনন্দের জন্য কেনা হচ্ছে খেলনা, অন্যদিকে সেই খেলনা বিক্রি করা শিশুটির কাছে দিনের শেষে একমুঠো খাবার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুকে ঘিরে যখন দেশে হাজার কোটি টাকার পণ্যের বাজার বাড়ছে, তখন একই দেশের লাখো শিশুর কাছে খাবার, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শৈশব এখনো অধরা। শিশুপণ্যের বাজারের এই বিস্তার তাই শুধু অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গল্প নয়; এর আড়ালে আছে ক্রয়ক্ষমতার তীব্র বৈষম্যেরও একটি ছবি। যে বাজারে শিশুদের জন্য খাবার, ডায়াপার, বেবি কেয়ার সামগ্রী ও খেলনার পেছনে বাড়ছে ভোক্তা ব্যয়, সেই বাজারের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে এমন বহু শিশু, যাদের পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই প্রতিদিন হিসাব কষতে হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশে শিশুদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় এক ভোক্তা-বাজার। শিশুখাদ্য, ফর্মুলা মিল্ক, সিরিয়াল, বেবি ফুড, ডায়াপার, বেবি ওয়াইপস, ত্বক ও চুলের যত্নের পণ্য থেকে শুরু করে খেলনা—শিশুকে কেন্দ্র করে পণ্যের ধরন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বাজারের পরিধিও। এর মধ্যে শিশুখাদ্যের বাজার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুধের বিকল্প ও ফর্মুলা, শিশুর জন্য তৈরি সিরিয়াল, প্রস্তুত ও শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি ঘিরে দেশে এখন বড় অঙ্কের বাণিজ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের হিসাবে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের বেবি ফুড বা শিশুখাদ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত; বাজারের প্রায় ৫৮ শতাংশের দখল রয়েছে একটি বিদেশি কোম্পানির। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, মূল্য বিক্রি বাড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ থাকায় বাজারের পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি সীমিত হচ্ছে এবং আগামী বছরগুলোতে মিল্ক ফর্মুলাই সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বাড়তে থাকা ক্যাটাগরি হতে পারে। শিশুখাদ্যের এই বাজারের বিস্তৃতি শুধু একটি পণ্যের বিক্রির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যাভ্যাস, কর্মজীবী বাবা-মায়ের সময়ের সংকট, শিশুর পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট পরামর্শ, ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা এবং পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়ার প্রবণতা। বাজার গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রে ফর্মুলা মিল্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ শিশুকে কেন্দ্র করে পরিবারের ব্যয়ের একটি আলাদা খাত তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রয়োজন, উদ্বেগ, অভ্যাস ও ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু একই বাজারে এমন একটি বৈপরীত্যও রয়েছে, যেখানে একটি পরিবারের কাছে শিশুর খাবারের ব্র্যান্ড, প্যাকেটের আকার ও পুষ্টিগুণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ; অন্য একটি পরিবারের কাছে প্রশ্নটি আরও মৌলিক—শিশুটি আজ পর্যাপ্ত খাবার পাবে কি না।

আরও পড়ুন: নতুন পদ্ধতিতে ফিরছে গ্রাম সরকার

বাংলাদেশে শিশুখাদ্যের বাজারের আকার নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় সংজ্ঞা ও পণ্যের পরিধিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কিছু শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাবে আমদানিনির্ভর ইনফ্যান্ট ফুড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার কয়েক হাজার কোটি টাকার পর্যায়ে রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাজারকে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি ধরে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে এসব হিসাবকে সরাসরি যোগ করে একটি একক বাজারমূল্য নির্ধারণ করা ঠিক নয়। তবে বিভিন্ন উৎসের তথ্য একসঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বাংলাদেশে শিশুদের খাবার এখন বড় একটি বাণিজ্যিক ক্যাটাগরি এবং এর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। ইউরোমনিটরের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেবি ফুড বাজারে সিংহভাগই আমদানি নির্ভর। এর মধ্যে শুধু নেসলে বাংলাদেশ প্রায় ৫৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরবর্তী বড় জায়গা দখল করে আছে বেবি নিউট্রিশন লিমিটেড, যার শেয়ার প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ শিশুখাদ্যের বাজারে বড় ব্র্যান্ডগুলোর প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী। একই সঙ্গে গবেষণাটি দেখিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার চাপ বাজারের ভলিউম বৃদ্ধিকে সীমিত করছে। শহুরে অভিভাবকদের একটি অংশ প্রিমিয়াম ফর্মুলার দিকে ঝুঁকলেও সামগ্রিক বাজারে সামর্থ্যের পার্থক্য স্পষ্ট। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুপণ্যের বাজারের প্রবৃদ্ধি মানেই সব শিশুর জীবনযাত্রার উন্নতি নয়। বাজারের হিসাব তৈরি হয় যারা পণ্য কিনতে পারে তাদের ব্যয় দিয়ে। সেখানে যে শিশু বা পরিবার বাজারের বাইরে থেকে যায়, তার উপস্থিতি বিক্রির পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। ফলে শিশুপণ্যের বাজার যত বড় হচ্ছে, সেই বাজারের নাগালের বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যাও আলাদা করে দেখার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।

শিশুখাদ্যের বাজারে শুধু দুধের ফর্মুলাই নয়, বয়স ও প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড ফর্মুলা, ফলো-অন ফর্মুলা, গ্রোয়িং-আপ মিল্ক, বিশেষ ধরনের ফর্মুলা, শুকনো শিশুখাদ্য ও প্রস্তুত খাবার—সব মিলিয়ে ক্যাটাগরিটি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। ইউরোমনিটর বলছে, আগামী বছরগুলোতে মিল্ক ফর্মুলাই বাংলাদেশের বেবি ফুড ক্যাটাগরির সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল অংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারের এই সম্প্রসারণের পেছনে জনসংখ্যার কাঠামো যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি ভূমিকা রাখে নগরায়ণ, পরিবারের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, আয় ও ব্যয়ের ধরন এবং শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট পণ্যের চাহিদা। আধুনিক খুচরা বাজার ও অনলাইন কেনাকাটার বিস্তারও এই পণ্যগুলোকে ভোক্তার কাছে সহজলভ্য করছে। কিন্তু সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা এক বিষয় নয়। কোনো পণ্য দোকানে থাকা মানেই তা প্রতিটি শিশুর নাগালের মধ্যে থাকা নয়। তবে শিশুখাদ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে বেবি ও চাইল্ড-স্পেসিফিক পণ্যের আরেকটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। ডায়াপার, বেবি ওয়াইপস, ত্বকের যত্নের পণ্য, বেবি টয়লেট্রিজ, চুলের যত্নের সামগ্রী, সান কেয়ার ও অন্যান্য শিশুবান্ধব পণ্য নিয়ে এই ক্যাটাগরি বিস্তৃত হচ্ছে। ইউরোমনিটরের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এই বাজারে শীর্ষ চার নির্মাতার সম্মিলিত আধিপত্য ছিল খুবই বেশি। স্কয়ার টয়লেট্রিজ ৪১ শতাংশ, লায়ন করপোরেশন ২৫ শতাংশ, জনসন অ্যান্ড জনসন ১৯ শতাংশ এবং ম্যারিকো ১০ শতাংশ খুচরা বিক্রয়মূল্যের শেয়ার ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শুরুতে এসিআইয়ের বেবি সফটের মতো নতুন ব্র্যান্ডও বাজারে এসেছে।

আরও পড়ুন: বিনিয়োগকারীর স্বার্থে পুঁজিবাজারে নজরদারি জোরদার, ইউনাইটেড গ্রুপসংশ্লিষ্ট লেনদেন তদন্তে বিএসইসি

শিশুকে ঘিরে বাণিজ্যের আরেকটি বড় ক্ষেত্র খেলনা। বাংলাদেশ সরকারের রপ্তানি উন্নয়নসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, দেশের খেলনার বাজারের মূল্য প্রায় বিলিয়ন ডলার। দেশে প্রায় ১০০ স্থানীয় উৎপাদক এক হাজারের বেশি ধরনের খেলনা তৈরি করছে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীরা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। খেলনা শিল্পকে এখন শুধু শিশুদের বিনোদনের বাজার হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি খাত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই বাজারের বিকাশের একটি দিক হলো দেশীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়া। একসময় খেলনার বাজারে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকলেও স্থানীয় উৎপাদনকারীরা ধীরে ধীরে বাজারের বড় অংশ দখল করেছে। ফলে শিশুদের জন্য তৈরি পণ্য এখন দেশীয় শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত। প্লাস্টিক শিল্পের সঙ্গে খেলনা উৎপাদনের সম্পর্ক, স্থানীয় উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সম্ভাবনাও এ বাজারকে অর্থনীতির একটি আলাদা অংশে পরিণত করেছে। তবে খেলনা শিশুর মৌলিক প্রয়োজন নয়। একটি শিশুর জন্য খেলনা আনন্দ, বিকাশ ও সৃজনশীলতার অংশ হতে পারে, কিন্তু খাবার, পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিচয় তার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। আর এখানেই শিশুপণ্যের বাজারের গল্পটি গিয়ে মিশে যায় বাংলাদেশের শিশুদের আরেক বাস্তবতায়।

একদিকে শিশুদের জন্য খাবার, দুধ, ডায়াপার, বেবি কেয়ার পণ্য ও খেলনার বাজার বড় হচ্ছে; নতুন ব্র্যান্ড আসছে, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ছে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে, অনলাইন ও আধুনিক খুচরা বাজার বিস্তৃত হচ্ছে। শিশুকে কেন্দ্র করে পরিবারের ভোক্তা ব্যয়ও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্তরে। কিন্তু অন্যদিকে দেশের এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যেখানে শিশুর জন্য আলাদা করে বাজার করার সুযোগই নেই। সেখানে শিশুর খাবার বলতে পরিবারের সবার জন্য রান্না হওয়া খাবার থেকে শিশুর ভাগ, কখনো তারও কম। কোনো কোনো ঘরে দিনের খাবার কমে গেলে প্রথমেই কমে যায় শিশুর প্লেটে থাকা খাবারের বৈচিত্র্য। শিশুর জন্য বাজার আছে, পণ্য আছে, ব্র্যান্ড আছে, বিজ্ঞাপন আছে, ক্রেতাও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব শিশুর জন্য কি সমান সুযোগ আছে? একটি শিশুর জীবন যেখানে বাজারের পণ্যের তালিকা দিয়ে শুরু হয়, আরেকটি শিশুর জীবন সেখানে শুরু হয় ক্ষুধা, অপুষ্টি, অনিশ্চয়তা কিংবা কাজের প্রয়োজন দিয়ে। এই দুই বাস্তবতা একই দেশের, একই সময়ের এবং একই বয়সী শিশুদের। বাংলাদেশের শিশুদের পরিস্থিতির দিকে তাকালে সেই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ শিশুদের খাদ্য পরিস্থিতির একটি গভীর বৈষম্য তুলে ধরেছে। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু খাদ্য দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ২১ দশমিক ১ শতাংশ গুরুতর এবং ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ মাঝারি মাত্রার খাদ্য দারিদ্র্যে। অর্থাৎ এই বয়সী প্রতি তিন শিশুর প্রায় দুইজন আগের দিন ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য পায়নি। গ্রামে এই হার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ, শহরে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে তা ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ। খাদ্য দারিদ্র্য মানে শুধু শিশুর পেটে খাবার না থাকা নয়। একটি শিশু হয়তো কোনো খাবার খেয়েছে, কিন্তু তার খাবারে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য নেই। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠী থেকে যথেষ্ট খাবার না পাওয়া তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বাজারে শিশুর জন্য যত ধরনের পুষ্টিকর খাবারই থাকুক, দরিদ্র পরিবারের শিশুটি যদি সেগুলোর নাগাল না পায়, তাহলে বাজারের সম্প্রসারণ তার জীবনে খুব সামান্যই পরিবর্তন আনে। শিশুর বঞ্চনাকে শুধু আয় দিয়ে মাপলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকেও সেই বাস্তবতা উঠে এসেছে। দেশে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই হার ২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই দারিদ্র্যের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, জীবনযাপনের মান, বাসস্থান ও মৌলিক সেবার একাধিক ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করে। অর্থাৎ একটি শিশু শুধু দরিদ্র পরিবারের সদস্য নয়; সে একই সঙ্গে পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সেবার একাধিক বঞ্চনার শিকার হতে পারে। এই জায়গায় শিশুপণ্যের বাজারের সঙ্গে শিশুর দারিদ্র্যের সম্পর্কটি আরও পরিষ্কার হয়। বাজার মূলত চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু শিশুর প্রয়োজন তার পরিবারের আয় যতটুকু, তার চেয়ে অনেক বেশি। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য খাবার যেমন দরকার, তেমনি দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা, পরিচয়, নিরাপদ বাসস্থান ও সুরক্ষা। পরিবারের আয় কমে গেলে এসবের একাধিক জায়গায় একসঙ্গে চাপ পড়ে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতার চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু অপুষ্টিজনিত ক্ষয়রোগে (ওয়েস্টিং) ভুগছে এবং ২১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু ওজনস্বল্পতায় ভুগছে। খর্বাকৃতি ও ওজনস্বল্পতার হার শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। তিনি আরও বলেন, ফুড ফর্টিফিকেশন বা খাদ্য সমৃদ্ধকরণ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে এক বা একাধিক ভিটামিন বা খনিজ উপাদান নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে চালের ফর্টিফিকেশনে ছয়টি পুষ্টি উপাদান সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পুষ্টি উপাদানগুলো হলো ভিটামিন এ, বি-১ ও বি-১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও জিঙ্ক। এ ছাড়া ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে নারী ও শিশুর ভিটামিন এর ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।

শিশুদের অধিকার প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, শিশুর অধিকার রক্ষায় নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা যে অঙ্গীকার করেছিলাম, তা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার শিশুবান্ধব সরকার। শিশুর মতামত এবং অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিশুদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নারী ও শিশুর সার্বিক সুরক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলেই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।