প্রতারণার নয়া কৌশল হানিট্রাপ, সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ
ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এবং মানুষের আবেগীয় দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সহজে অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে হানিট্রাপ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণার ঘটনা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। অপরাধীরা এখন আর শুধু সশরীরে নয়, বরং সাইবার জগৎ ব্যবহার করে ঘরে বসেই এই চক্র পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ‘হানিট্রাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইলিং একটি বড় সামাজিক ও অপরাধমূলক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাধারণত ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
আধুনিক জীবনে মানুষের ব্যস্ততা ও একাকীত্বকে অপরাধীরা পুঁজি করে। একটুখানি মনোযোগ, প্রশংসা বা রোমান্টিক আলাপের আশায় অনেকেই অপরিচিত সুন্দরীদের (বা সুদর্শন পুরুষদের) প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজের অজান্তেই ফাঁদে পা দেন। ফাঁদে ফেলার পর অপরাধীরা সাধারণত টার্গেটকে ভিডিও কলে আসার অনুরোধ করে। ভিডিও কলে আসার পর কৌশলে স্ক্রিন রেকর্ড বা আপত্তিকর ছবি ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা পরিবারের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। হানিট্র্যাপের ফাঁদে ফেলে হত্যার একাধিক ঘটনাও ঘটেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে তা প্রমাণিতও হয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা হানিট্র্যাপ কেবল টাকা ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তবে বেশ কিছু অপরাধী চক্র বা পারিবারিক শত্রুতার জেরে এটি চরম পর্যায়ে অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। ডিজিটাল ফাঁদের পর যখন কোনো ভুক্তভোগীকে দেখা করার জন্য ডেকে নেওয়া হয়, তখন সাধারণ প্রতারণা নিমেষেই ভয়ংকর অপরাধে রূপ নেয়। ঢাকার খিলগাঁও, তুরাগ বা সাভারের মতো এলাকাগুলোতে চক্রের নিজস্ব ভাড়া করা গোপন ফ্ল্যাট থাকে। ভুক্তভোগী সেখানে প্রবেশ করা মাত্রই অস্ত্রধারী বা সংঘবদ্ধ অপরাধীরা তাকে জিম্মি করে ফেলে।
আরও পড়ুন: সৌদিগামী ১৫৯ ফ্লাইট বাতিল
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে টর্চার বেল্ট, ওয়াকিটকি ও ধারালো অস্ত্র পাওয়া গেছে, যা দিয়ে ভুক্তভোগীকে নির্মমভাবে মারধর করে এটিএম কার্ডের পিন বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। হানিট্রাপের শিকার হওয়া বেশির ভাগ মানুষই লোকলজ্জা, মান-সম্মান এবং আইনি জটিলতার ভয়ে শুরুতে পুলিশকে কিছু জানান না। ভুক্তভোগীদের এই নীরবতা ও গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বারবার ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে, যা এই অপরাধের গ্রাফ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই হয় ঘনিষ্ঠতা। তারপর দেখা করার প্রস্তাব। কখনও ভিডিও কলে ব্যক্তিগত মুহূর্ত রেকর্ড, কখনও নির্জন স্থানে ডেকে নেওয়া, আবার কখনও সম্পর্কের অভিনয় করে অর্থ আদায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘হানি ট্র্যাপ’ শুধু সিনেমার গল্প নয়, বাস্তব জীবনের একটি ক্রমবর্ধমান অপরাধ কৌশলে পরিণত হয়েছে। এর শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা অর্থ হারানোর পাশাপাশি সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি, ব্ল্যাকমেইল এমনকি শারীরিক ঝুঁকিরও মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হানি ট্র্যাপের মূল অস্ত্র প্রযুক্তি নয়, মানুষের আবেগ। বিশ্বাস, আকর্ষণ, একাকীত্ব কিংবা গোপনীয়তার সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা ফাঁদ তৈরি করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিখ্যাত নর্তকী ও গুপ্তচর মাতা হারি থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে শত্রুশিবিরের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে এই টোপ ব্যবহার করা হতো হামেশা। তবে দিন বদলেছে। প্রযুক্তির এ সময়ে হানি ট্র্যাপ আর শুধু গোয়েন্দা সংস্থার জালে আটকে নেই। হানিট্রাপের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো জীবনের ঝুঁকি। ফাঁদে পড়া কোনো ব্যক্তি যদি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায় বা ধস্তাধস্তি করার চেষ্টা করে, তবে চক্রের সদস্যরা চরম সহিংস হয়ে ওঠে। নারীদের প্রলোভনে পড়ে নির্জন স্থানে গিয়ে উবার চালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে প্রতারণার অভিযোগে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং দুজন নারী। ডিবির ভাষ্য, প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন জিৎ ভক্ত ওরফে আব্দুর রহমান, প্রীতম বিশ্বাস ওরফে অনিক শেখ, অর্থজীৎ ভক্ত ওরফে সিদ্ধার্থ, সাবরিন কবির প্রেমা ওরফে নেহা ও সাদিয়া ইয়াসমিন ওরফে মাহি। গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘চক্রটির নারী সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে মধ্যবয়সী, বয়স্ক ব্যবসায়ীসহ বিত্তবান পুরুষদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। পরে কৌশলে তাঁদের নির্ধারিত বাসা বা হোটেলকক্ষে ডেকে নেওয়া হতো।
আরও পড়ুন: বহুমুখী চ্যালেঞ্জে সরকার
সেখানে চক্রটির পুরুষ সদস্যরা ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে ভয় দেখাতেন ও শারীরিক নির্যাতন করতেন। এ সময় তাঁদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করা হতো।’তিনি আরো বলেন, ‘এমনকি একবার অর্থ আদায়ের পরও একইভাবে ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে আবারও টাকা দাবি করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন, তিনটি ফাঁকা চেক ও একটি টর্চার বেল্ট উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রটির প্রধান জিৎ ভক্ত ওরফে আব্দুর রহমান। তিনি তাঁর ভাগ্নে প্রীতম বিশ্বাস ওরফে অনিক শেখ ও ভাগ্নের স্ত্রী সাবরিন কবির প্রেমা ওরফে নেহাকে দিয়ে এই হানি ট্র্যাপ চালিয়ে আসছিলেন।’ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে চক্রটির সদস্যরা ঘন ঘন বাসা ও আস্তানা পরিবর্তন করতেন জানিয়ে ডিবি প্রধান বলেন, ‘পাশাপাশি ভুয়া নামে নিবন্ধিত সিম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া নামের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন তাঁরা। গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করে তুরাগ এলাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।’ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, হানি ট্র্যাপ চক্রগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সমাজের বিত্তবান ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করছে।
তারা প্রথমে সম্পর্ক গড়ে তোলে, পরে একান্ত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করে। আমরা সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এসব চক্রকে একে একে আইনের আওতায় নিয়ে আসছি। সাধারণ মানুষের উচিত অপরিচিত কারও সঙ্গে ভার্চুয়ালি মেলামেশার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় দুই ডজনের বেশি বড় মামলা দায়ের হয়েছে। এসব ঘটনায় নারীসহ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, হানি ট্র্যাপের শিকার সাধারণত বিত্তশালী, উচ্চাভিলাষী ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই বেশি হন। অপরাধীরা প্রথমে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় প্রোফাইল ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে পরিচয় গড়ে তোলে। এরপর ধাপে ধাপে বিশ্বাস অর্জন করে চা-আড্ডা কিংবা ব্যক্তিগত সাক্ষাতের প্রস্তাব দেয়। একাকীত্ব, মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই তারা ফাঁদ পাতে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুনাম রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। অপরাধচক্র এই দুর্বলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। একান্ত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও গোপনে ধারণ করে তা পরিবার, কর্মস্থল কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। মানসম্মানের ভয়ে অনেকেই আইনি সহায়তা নিতে চান না, ফলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) অপরাধ ও সুশাসন বিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. জামিলুর রহমান বলেন, ডিজিটাল আসক্তি এবং মানুষের অতিলোভ বা সরলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। হানি ট্র্যাপ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, এটি করপোরেট ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কর্মকর্তাদের সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সচেতন করা। পুলিশের পরামর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারও বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণের আগে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির আমন্ত্রণে নির্জন বা অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয় না পেয়ে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা অথবা নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) কিংবা মামলা করতে হবে। সর্বোপরি, হানি ট্র্যাপের শিকার হওয়া শুধু সরলতা বা অসতর্কতার ফল নয়। অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে মানুষের আবেগ, বিশ্বাস এবং দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং একটি অপরাধকৌশল হিসেবে দেখা জরুরি। ডিজিটাল যুগে পরিচয় তৈরি করা সহজ, কিন্তু বিশ্বাস করার আগে যাচাই করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের সতর্কতা অনেক সময় বড় ধরনের আর্থিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।





