ঢাকায় আজ বিএনপি'র প্রথম সমাবেশে’ লাখো উপস্থিতির টার্গেট
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় ও সরকার গঠনের পর আজ মহান মে দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম দলীয় সমাবেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি। এই সমাবেশটি রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্টিত হবে। এতে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বড় ধরনের শোডাউন দিতে চায় সরকারি দলটি। একইসঙ্গে আজকের শ্রমিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে রাজপথে ফিরছে টানা ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দল বিএনপি।
শুক্রবার (১ মে) আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে শ্রমিক দলের উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এদিন দুপুর আড়াইটায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সড়কে এ সমাবেশে প্রধান অতিথি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমিক নেতাদের প্রত্যাশা; তারেক রহমান আগামী দিনের রাজনীতির দিক নির্দেশনামূলক বার্তা দেবেন শ্রমিক সমাবেশে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা ১১ দলীয় ঐক্যের
শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে শ্রমিক সমাবেশে রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ, নরসিংদীর নেতাকর্মীরা সমাবেশে অংশ নেবেন। সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে দফায় দফায় বৈঠক করছেন শ্রমিক দল ও শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। সমাবেশে মূলত শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় প্রাধান্য থাকলেও এই সমাবেশ বিএনপির অন্য অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে সহায়ক বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা। ‘শ্রম দিয়ে শিল্প গড়বো, দেশের আঁধার ঘুচিয়ে দেবো’ স্লোগানে ১৯৭৯ সালের ১ মে এই শ্রমিক দল প্রতিষ্ঠা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি আদায় আর উৎপাদন বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংগঠনটি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিক সমাবেশ সফল করতে রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যোগ দেবেন বলে আশা করছেন আয়োজকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে শ্রমিক সমাবেশে অংশ নিতে রাজধানীর আশপাশের জেলা থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানার ব্যানারে নেতাকর্মীরা এই সমাবেশে যোগ দেবেন।
আরও পড়ুন: যশোরের সেই শিশুর জন্য উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়ম শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করা হয়েছে। মূলত বড় ধরনের শোডাউনের পরিকল্পনা আছে। শ্রমিক দল ও সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদসহ অন্য শ্রমিক সংগঠনগুলো সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি আদায় আর উৎপাদন বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি এখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর গ্রুপিংয়ে বিপর্যস্ত। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন শ্রমিকদলের নেতাকর্মী। এমনকি শ্রমিকদের দাবি আদায়েও কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি সংগঠনটির নেতৃত্বের। কেবল নামমাত্র কিছু কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দায় সারেন নেতারা। শ্রমিক দলের গঠনতন্ত্রে প্রদত্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাস্তব কর্মকাণ্ডের তেমন কোনো সাদৃশ্যও নেই।
তারপরও শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা দাবিগুলোর মধ্যে থাকবে কর্মস্থলে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন; শ্রমিক হত্যার বিচার ও শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ করা; শিল্পকারখানায় আউটসোর্সিং বন্ধ করে স্থায়ী পদ সৃষ্টি; বন্ধ শিল্প চালু করা ও নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তোলা; বৈষম্যহীন জাতীয় পে-স্কেল ও মজুরি হার ঘোষণা করা; জরুরি পরিষেবা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল; নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা; অবাধ ও গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত; সব প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার চালু এবং খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম কমানো।
সম্প্রতি এক যৌথসভা শেষে অকপটে বিষয়টি শিকার করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যত শ্রমিক আছেন তাদের মধ্য থেকে একভাগ শ্রমিককেও আমরা সংগঠিত করতে পারিনি। আমরা যদি ২ ভাগ লোককে সংগঠিত করতে পারি, তাহলে আমাদের শ্রমিক সমাবেশ সফল হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শ্রমিক দিবসটি শ্রমজীবী মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। অধিকারহারা মানুষ মহান মে দিবসে উদ্দীপ্ত হয়। আমরা আশা করছি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের পহেলা মে যে সমাবেশ, সেটি ঐতিহাসিক সমাবেশে পরিণত হবে।
শ্রমিক দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বড় সমাবেশের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো বৈঠক করছেন। সবার একটাই লক্ষ্যÑ শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা। সমাবেশে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি।
এদিকে, ঢাকায় পহেলা মে শ্রমিক সমাবেশে প্রথমবারের মতো বক্তব্য রাখবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সমাবেশে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির প্রত্যাশা করছে দলটি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, মহান মে দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখবেন।
তিনি বলেন, এবারের মে দিবস একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ন্যূনতম মজুরির জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা না হওয়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো শ্রমজীবী মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সরকারি পদ বিলুপ্ত করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ায় শ্রমের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি পাটসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশীয় শিল্পের পরিবর্তে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কাজের পরিবেশ, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হবে এই সমাবেশ থেকে। সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগমের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করছি লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সমাবেশে অংশ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর শ্রমজীবী মানুষের জন্য যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা আশাবাদী। আগামী পাঁচ বছরে তারা এসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে চান বলেও জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে। তাই ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর আরেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্র্নিধারণে জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ডকে আরও কার্যকর করার দাবি জানানো হবে। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের অন্যান্য সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় ও ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এরপর থেকে ব্যস্ত সময় পার করছে নতুন সরকার। দীর্ঘদিন পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হিসেবে অনেকে এখন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়েছেন। ফলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দলের ভেতর থেকে তাগিদ উঠে সরকারের পাশাপাশি দলকে সক্রিয় করার।
এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দল ও বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ঢেলে সাজানোর কথাও বলেন কেউ কেউ। তারই ধারাবাহিকতায় এবার দলকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। উদ্দেশ্যে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল ও শক্তিশালী করা। এমন পরিস্থিতিতে সারাদেশে দলের ৮২ সাংগঠনিক জেলা বিএনপির ইউনিট শীর্ষ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক কিংবা সদস্য সচিব পদে থাকা নেতাদের ঢাকায় ডাকা হয়েছে।
আগামী ৯ মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সাংগঠনিক ইউনিট-সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে মতাবনিময় সভা করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের বেশকয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।





