২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: রক্তে লেখা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি

Sadek Ali
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ন, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:৩৭ অপরাহ্ন, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা শহরের বাতাসে নেমে আসে অদৃশ্য এক চাপা উত্তেজনা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা যেন পরিণত হয় প্রতিবাদের স্পন্দিত কেন্দ্রবিন্দুতে। আগের দিন জারি করা ১৪৪ ধারা অমান্য করে ছাত্ররা সমবেত হতে শুরু করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঘোষিত কর্মসূচি স্থগিত না করার সিদ্ধান্তে তারা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাদের বিশ্বাস ছিল- নিজের ভাষার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।

সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শান্তিপূর্ণভাবে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ছাত্ররা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেন, যাতে বাধা এলে তারা ছড়িয়ে পড়ে আবার একত্রিত হতে পারেন। সবার কণ্ঠে একই স্লোগান- “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।”

আরও পড়ুন: ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে ছিল কড়া পুলিশি প্রহরা। ছাত্ররা বের হওয়ার চেষ্টা করতেই পুলিশ বাধা দেয়। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আসে বাতাস, তবু দমে যাননি ছাত্ররা। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট, তাদের অবস্থান ছিল অটল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে একসময় পুলিশ গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এর সামনে ও আশপাশে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন কয়েকজন শিক্ষার্থী। শহীদ হন আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালামসহ আরও অনেকে। রাজপথ লাল হয়ে ওঠে তরুণ প্রাণের তাজা রক্তে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে এ ছিল এক নির্মম আত্মত্যাগ।

আরও পড়ুন: চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে সংগঠিত প্রস্তুতিতে উত্তাল ঢাকা

সেদিন বিকেলেই শোক ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো শহর। হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে থাকেন স্বজনেরা, সহপাঠীরা, সাধারণ মানুষ। কান্না, প্রতিবাদ আর ক্ষোভ মিলেমিশে এক নতুন প্রতিজ্ঞায় রূপ নেয়। ভাষার দাবিতে দেওয়া এই আত্মবলিদান আন্দোলনকে দেয় অনন্য গতি ও গভীরতা।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ আর কেবল একটি তারিখ নয়- এটি হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মপরিচয়, অধিকারচেতনা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক। সেই দিনের রক্তস্নাত ঘটনা প্রমাণ করে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির আত্মা, তার ইতিহাস ও তার ভবিষ্যৎ।

পরবর্তীকালে এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়- যা বাঙালির সংগ্রামকে বিশ্বমানবতার ইতিহাসে এক গৌরবময় স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।