ওষুধ শিল্প ধ্বংসে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র
# দুটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা
# ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করে বাংলাদেশ
আরও পড়ুন: অ্যাকশনে মাঠে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী
# ওষুধ শিল্পের বর্তমান বাজারের আকার ৩৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা
# বিশ্বের ৪৮টি কম উন্নত দেশের মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষে
আরও পড়ুন: নানান সংকটের মধ্যেও মৎস্য খাতে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য
# দেশের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ ওষুধের চাহিদা মেটায় এই শিল্প
মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে গাজীপুরে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার ফলে দেশের শীর্ষ দুই ওষুধ কোম্পানির কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে গেছে, যা দেশের ওষুধ উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বা নাশকতার জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে ওষুধ শিল্পের বর্তমান বাজারের আকার ৩৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। শিল্পটি প্রায় দুই লাখ মানুষকে সরাসরি এবং আরও ৫ লাখ মানুষকে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ উৎপাদন, বিপণন ও খুচরা বিক্রয়ে জড়িত। বিগত বেশ কয়েক দশকে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বেশ শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে। দেশের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ ওষুধের চাহিদা মেটায় এই শিল্প। ১৫০টিরও বেশি দেশে সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ রফতানি করে বাংলাদেশ। পোশাক শিল্পের পর ওষুধ শিল্পকে দেশের একটি প্রধান রফতানি পণ্য হিসেবে দেখছে। বিশ্বের ৪৮টি কম উন্নত দেশের মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষে।
তবে ২০২০ সালে রফতানি দেশের মধ্যে ৭২তম স্থানে। ২০৩৩ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্ব ছাড় পাওয়ার কারণে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে এগিয়েছে অনেক। বাংলাদেশের ওষুধ খাতের এই দ্রুত বিকাশ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী কোনো চক্র পরিকল্পিতভাবে এই জোড়া অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না, তা নিয়ে খোদ কারখানার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এর আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা ভয়াবহ আগুনেও প্রায় ৪৫টি ওষুধ কোম্পানির আমদানি করা বিপুল পরিমাণ জীবনরক্ষাকারী কাঁচামাল ধ্বংস হয়েছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই পর পর দুই কারখানায় আগুন লাগার ঘটনাকে অনেকেই ধারাবাহিক চক্রান্তের অংশ মনে করছেন। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণে ওষুধ উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুড়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি নতুন করে আমদানি করতে দীর্ঘ সময় লাগবে, যা দেশের বাজারে জরুরি ওষুধের ঘাটতি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ওষুধ কারখানায় আকস্মিক ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেবল কোটি কোটি টাকার সম্পদই ছাই করে দেয়নি, বরং দেশের অন্যতম সফল ও স্বনির্ভর খাত ‘ওষুধ শিল্প’কে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জীবনদায়ী ওষুধ, অত্যন্ত সংবেদনশীল কাঁচামাল এবং আমদানিকৃত মূল্যবান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি পুড়ে ছারখার হওয়ার এই ঘটনাগুলো কেবল সাধারণ দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সুদূরপ্রসারী অন্তর্ঘাত বা ষড়যন্ত্র—সেই প্রশ্ন এখন চারদিকে। দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধের বাজার সচল রাখা এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুনাম ধরে রাখার স্বার্থে এই অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদঘাটন এবং এই শিল্পের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।’
ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ও ইবনে সিনা উভয়ই দেশের শীর্ষ ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের টঙ্গী কারখানাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়ায় তাদের উৎপাদিত নির্দিষ্ট কিছু জরুরি ওষুধ, বিশেষ করে জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশন ও ক্যাপসুলের সরবরাহ বাজারে সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। সরবরাহ কমলে খুচরা বাজারে এসব ওষুধের কৃত্রিম সংকট বা দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ রপ্তানিতে অন্যতম বড় অংশীদার। কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের বিদেশি অর্ডারগুলো সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হবে, যা সামগ্রিক ওষুধ রপ্তানি আয়ে সাময়িক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তিন দিনের মাথায় গাজীপুরের সফিপুরস্থ ইবনে সিনা ন্যাচারাল মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রির গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কারখানার ছয়তলা ভবনের নিচতলায় থাকা স্টোরে লাগা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট। গত শনিবার বিকেল ৪টা ২২ মিনিটের দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের স্টেশন কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর বিকেল ৪টা ২৪ মিনিটে তারা খবর পায়। এরপর স্টেশন থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই কারখানায় বিকেল ৪টা ৩৪ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ফায়ার সার্ভিস জানায়, আগুন নিয়ন্ত্রণে শুরুতে কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিট কাজ শুরু করে। এর আগে গত বুধবার গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগআলী এলাকায় অবস্থিত ‘ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর কারখানায় লাগা ভয়াবহ আগুন দীর্ঘ চার ঘণ্টার যৌথ প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ওই ওষুধ কারখানার দ্বিতীয় ইউনিটের ৫ তলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়া পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে আকাশের অনেকটাই ঘন কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় এবং আশপাশের এলাকায় তীব্র তাপ ও রাসায়নিক পদার্থের ঝাঁঝালো গন্ধে মারাত্মক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কারখানার ভেতরে কেমিক্যাল, বিপজ্জনক কাঁচামাল এবং ওষুধ তৈরির বিভিন্ন শিল্পজাত উপকরণ মজুত থাকায় আগুন দ্রুত সংহারী রূপ ধারণ করে। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ দিয়ে নির্মিত আধুনিক ভবনটিতে তাপমাত্রা মারাত্মক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কারখানার ভেতরের পানির সরবরাহ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় উদ্ধার কাজ জটিল হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে প্রথমে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পরবর্তীতে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় গাজীপুর, উত্তরা, কুর্মিটোলা, পূর্বাচল ও রাজেন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন ফায়ার স্টেশন থেকে পানিবাহী গাড়িসহ মোট ২১টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপণে অংশ নেয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ফায়ার বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশের সদস্যরা যৌথভাবে মাঠে নামেন, দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে আগুন তীব্র রূপ নিয়েছিল। উভয় ঘটনাতেই কারখানার শ্রমিকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরণের কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের আগুন নেভাতে গিয়ে ৩ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হন।
গাজীপুরের দুটি ওষুধ কারখানায় (ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ও ইবনে সিনা) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত অংক তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি, তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিপুল পরিমাণ মালামাল ও পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও দুই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গঠিত তদন্ত কমিটি বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ ও পুড়ে যাওয়া মালামালের স্টক রেজিস্টার মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব নিরূপণের কাজ করছে। এই ঘটনার পর দেশের অন্যান্য ওষুধ কারখানাগুলোতে অগ্নি নিরাপত্তা জোরদার করার চাপ বাড়ছে। এছাড়া ভবিষ্যতে ওষুধ কারখানাগুলোর জন্য বীমা প্রিমিয়ামের হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পরোক্ষভাবে ওষুধ উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে এই জোড়া অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো সংকট তৈরি না করলেও, স্বল্পমেয়াদে স্থানীয় বাজারে ওষুধের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অভ্যন্তরীণ বাজারের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মেটানো এই শিল্পে পর পর দুটি শীর্ষস্থানীয় কারখানায় অগ্নিকাণ্ড সরবরাহ শৃঙ্খলে কিছুটা চাপ তৈরি করবে।





