এআই দিয়ে তৈরি নতুন ভাইরাসের ডিএনএ নকশা, বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী সাফল্য
লেখা, ছবি কিংবা সফটওয়্যার তৈরির পর এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রবেশ করেছে জীববিজ্ঞানের আরও গভীরে। বিজ্ঞানীরা এআই ব্যবহার করে প্রকৃতিতে আগে দেখা যায়নি—এমন নতুন ধরনের ভাইরাসের জিনোম বা ডিএনএ নকশা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী ‘ইভো’ (Evo) নামের একটি জেনারেটিভ এআই মডেল ব্যবহার করে এ গবেষণা করেছেন। গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে তৈরি নকশা অনুসরণ করে বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে নতুন কিছু ব্যাকটেরিওফাজ তৈরি করেছেন। এগুলো ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে সক্ষম। ব্যাকটেরিওফাজ হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যা ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে।
আরও পড়ুন: বর্ণিল আয়োজনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত
লাখ লাখ জিনোম থেকে শিখেছে এআই
গবেষকদের তৈরি ইভো মডেলকে মানুষের ভাষার মডেলের মতোই বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে টেক্সটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে লাখ লাখ জিনোমের ডিএনএ তথ্য। এই তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মডেলটি ডিএনএর বিন্যাস এবং বিবর্তনের বিভিন্ন ধরন বা প্যাটার্ন শিখেছে। এরপর সেই জ্ঞান ব্যবহার করে প্রকৃতিতে আগে দেখা যায়নি এমন ভাইরাল জিনোমের নকশা তৈরি করা হয়।
আরও পড়ুন: নব্বই দশকের ট্রেন্ডিং ছবি ভাইরাল, বানাতে পারবেন আপনিও-দেখুন সেরা ২০ প্রম্পট
বিজ্ঞানীরা পরে এআইয়ের তৈরি নকশার ভিত্তিতে ডিএনএ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে পরীক্ষা চালান।
গবেষণায় তৈরি করা ১৬টি কৃত্রিম ফাজ ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে সক্ষম হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থাকেও অতিক্রম করতে পেরেছে।
গবেষকদের দাবি, তৈরি করা ভাইরাসগুলোর জিনগত গঠন প্রকৃতিতে বিদ্যমান ভাইরাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা।
মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকি?
গবেষকদের দাবি, তাঁদের প্রশিক্ষণ মডেলে মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি করে এমন প্যাথোজেনের জিনগত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে গবেষণায় তৈরি ভাইরাসগুলো মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটানোর জন্য তৈরি নয়।
তবে এআই দিয়ে জীবের জিনোম নকশা তৈরির এই সক্ষমতা নিয়ে জীবসুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে ক্ষতিকর জীবাণু বা জৈব অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জনস হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির বায়োসিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ থমাস ইংলেসবি ও মরিটজ হাংক এ ধরনের গবেষণায় কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মানুষের, প্রাণী বা কৃষি ফসলের ক্ষতি করতে পারে এমন প্যাথোজেন তৈরিতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধের পক্ষেও তাঁরা মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিনথেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টম এলিস মনে করেন, মানুষের জন্য ক্ষতিকর জৈব অস্ত্র তৈরি করা এখনো সহজ নয়। তাঁর মতে, ইভো দিয়ে তৈরি ভাইরাসগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সহজ ধরনের হওয়ায় গবেষণায় এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
ঝুঁকির পাশাপাশি এই প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ‘সুপারবাগ’ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে কাস্টমাইজড ব্যাকটেরিওফাজ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এতে ভবিষ্যতে প্রকৃতি থেকে উপযুক্ত ভাইরাস খুঁজে বের করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে—এমন ভাইরাস নকশা করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে জীববিজ্ঞান ও এআইয়ের এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথাযথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তিটি চিকিৎসা গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে, আবার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে নতুন জৈবিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।





