অবিরাম বৃষ্টি আর ঢলে হাওর নিম্নাঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা
নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত, পাকা ধানের সোনালী মাঠ তলিয়ে এবার ভাঙন শুরু
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ হাওরাঞ্চলের নতুন এলাকা প্লাবিত। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধানের সোনালী মাঠ। বাড়ছে আগাম বন্যার আশঙ্কা। ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে প্রতিদিনই তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের নতুন নতুন এলাকার ধানখেত। টানা বৃষ্টিতে খেতের ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। আর রোদে শুকাতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে মাড়াই করা ধান। ফসলের ক্ষতিতে বিপাকে কৃষকেরা। এছাড়াও দেশের উত্তরের জনপদের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
হবিগঞ্জে বৃষ্টির মধ্যেই পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন কৃষকেরা। বৈরী আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটে ফসল নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন তারা। মৌলভীবাজারেও থেমে থেমে বৃষ্টি। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো নিয়ে বিড়ম্বনায় চাষিরা। বৃষ্টিতে পানি ওঠায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাউয়াদিঘি ও হাকালুকি হাওরের ধান।
আরও পড়ুন: ৩২ জেলায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস
সুনামগঞ্জে নতুন করে পানিতে তলিয়েছে ২ হাজারের বেশি হেক্টর জমির ধান। আগামী ৭ মে পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, পরবর্তী ৪ দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। সেক্ষেত্রে সুনামগঞ্জে আগাম বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ভারী বৃষ্টি হলে বন্যা দেখা দিতে পারে।
উজানের ঢলে কিশোরগঞ্জের নদ-নদীর পানি বাড়ায় তলিয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের ৮ উপজেলার সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমির ধান। এদিকে বাড়তি মজুরি দিয়েও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক।
আরও পড়ুন: ২০ জেলায় বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার কংশ, উপদাখালি সহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়ছে। বেশিরভাগ হাওরের ধান কাটা বাকি থাকায় ফসল নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এসব অঞ্চলে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া আগামী কয়েকদিন এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোণায় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে হাওরে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ধানখেত এবং জলাবদ্ধতায় ধান কাটার গতি কমে যাওয়ায় কৃষকেরা দিশেহারা।
তবে সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে দেশের ৫টি জেলায় আগামী কয়েকদিনে বন্যার আশঙ্কা করছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটি জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বৃষ্টিতে দ্রুত পানি বাড়লে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। একইসঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসরতদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলে তলিয়ে গেছে সড়ক ও বিদ্যালয়: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে করে অনেক সড়ক তলিয়ে বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া, পূর্ব শ্রীমঙ্গল, সবুজবাগ, লালবাগ, রুপসপুর এবং আশিদ্রোন ইউনিয়নের রামনগর, গাজিপুর, মুসলিমবাগ এলাকাসহ নিম্নাঞ্চলের বেশকিছু গ্রাম তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সড়ক এবং গাজিপুর সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া শহরতলীর বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমে আছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি জমে চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। দুইটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক মানুষের বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিচু এলাকার অনেক দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারী বৃষ্টি হলেই সদর ইউনিয়ন ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক, প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা দিন দিন ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। গাজিপুর ও ভাড়াউড়া সড়কে প্রায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় রিকশা ও সিএনজি চলাচলেও সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।
মুসলিমবাগ এলাকার বাসিন্দা কালাম আহমদ বলেন, ভারী বৃষ্টি হলেই শহরের বিভিন্ন এলাকা ডুবে যায়। বিশেষ করে গাজিপুর, রামনগর সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে যায়। শুক্রবার বৃষ্টিতে অনেক স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় সাধারণ মানুষেরা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা রুবেল আহমদ বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রাম। শুক্রবারের বৃষ্টিতেও পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে চলমান পরীক্ষাসহ বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার এলাকাবাসী।
কুড়িগ্রামে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি: কুড়িগ্রামের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে আবারও হুমকিতে পড়েছে জেলার শত শত পরিবার। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। ফলে তীরবর্তী হাজারো মানুষ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। বিশেষ করে চার নদীর তীরবর্তী কৃষকরা প্রতিদিনই আবাদি জমি হারাচ্ছেন। ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন ফসল নদীতে চলে যাওয়ায় পড়েছেন চরম সংকটে। অনেক বসতবাড়িও এখন ঝুঁকির মুখে।
এদিকে, দলদলিয়া ইউনিয়নের চাপড়ারপাড় থেকে গোড়াইপিয়ার পর্যন্ত প্রায় ২-৩ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও গোড়াইপিয়ার গ্রামে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই জমি বিলীন হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা কাওছার আহমেদ জানান, গোড়াইপিয়ার গ্রামের মূল ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ বিগত বছরগুলোতে বিলীন হয়েছে। এ বছর বর্ষা শুরুর আগেই তিস্তা আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে গ্রামের বাকি অংশও নদীতে বিলীন হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন জরুরি। এতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
তবে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এক লাখ জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু হবে।





