ছাড়ের মোড়কে মূল্য কারসাজি: বাণিজ্য মেলায় ক্রেতা বিভ্রান্তি
বাহারি আলোকসজ্জা, দেশি-বিদেশি পণ্যের সমাহার এবং বড় অক্ষরে লেখা বিশেষ ছাড়—সব মিলিয়ে ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা যেন কেনাকাটার এক বিশাল আয়োজন। তবে এই ঝলমলে পরিবেশের আড়ালেই ক্রেতাদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ছাড় নয় বরং মূল্য বাড়িয়ে ছাড়ের নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে অনেক স্টলে।
পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত মেলায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্টলেই ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা ঝুলছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক পণ্যের দাম আগেই অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন দর্শনার্থীরা। বাড়তি দামের ওপর কাগুজে ছাড় দেখিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে—যা মেলার মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় সাংবাদিক পরিচয়ে শ্রমিক নেতাদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ
মেলা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাতে গোনা কিছু স্টল প্রকৃত মূল্যেই পণ্য বিক্রি করলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী ক্রেতা আকৃষ্ট করতে ভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। কেউ পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ নির্ধারণ করে পরে ছাড়ের কথা বলছেন, আবার কেউ মূল দাম গোপন রেখে কৃত্রিম ছাড়ের হার প্রদর্শন করছেন। এতে সাধারণ ক্রেতারা বুঝে উঠতে না পারলেও সচেতন মহল বিষয়টিকে স্পষ্ট প্রতারণা হিসেবে দেখছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুটির শিল্পপণ্যের বিক্রয়কর্মী মনিরা সুলতানা বলেন, “এবার দর্শনার্থী ও বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। তবে স্টল ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় তুলনায় লাভের বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত। ক্রেতাদের বড় অংশই উল্লেখযোগ্য ছাড় আশা করেন। সেই চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় মূল্য নির্ধারণে কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। তবুও আমরা আশাবাদী।”
আরও পড়ুন: পাচারচক্রের হাত থেকে শিশু উদ্ধার, পাচারকারী নারী গ্রেফতার
নারী উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা তুলে ধরে জয়িতা ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা রোকসানা আক্তার বলেন, “মেলায় এখন ভিড় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত দামে পণ্য বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অধিকাংশ দর্শনার্থী বড় ছাড় না পেলে আগ্রহ হারান। এতে উদ্যোক্তারা আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন। তারপরও মেলার শেষ দিকে ভালো বিক্রির প্রত্যাশা করছি।”
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শ্রী প্রিতি ঘোষ বলেন, “অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এখানে মূলত তাদের পণ্য প্রদর্শনে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু যে ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে, তা কতটা বাস্তব—সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের উপস্থিতি ও তদারকি আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।”
যাতায়াত ব্যবস্থার দিক থেকে এবার মেলায় তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে ৩০০ ফুট সড়ক হয়ে সরাসরি মেলায় প্রবেশকারীরা যানজট ছাড়াই মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছাতে পারছেন। তবে ঢাকা বাইপাস সড়কে চলমান নির্মাণকাজের কারণে কিছু এলাকায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তি এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
মেলার সার্বিক নিরাপত্তায় প্রায় সাত শতাধিক পুলিশ সদস্যসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও কয়েকটি স্থানে ভাসমান হকারদের উৎপাত লক্ষ্য করা গেছে।
মেলার পরিচালক ও ইপিবির সচিব তরফদার সোহেল বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, “ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার লক্ষ্য হলো দেশীয় পণ্যের মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে সংযোগ সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে অনেক প্রতিষ্ঠান ছাড় দিচ্ছে। তবে ছাড়ের নামে কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
মেলা সূত্র জানায়, এবছর পলিথিন ব্যাগ ও সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিকল্প হিসেবে পাট ও বস্ত্রজাত পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় রূপগঞ্জ উপজেলার উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ না থাকায় অনেক দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক এই আয়োজন যেখানে ক্রেতা ও উদ্যোক্তার মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কথা, সেখানে ছাড়ের নামে মূল্য কারসাজির অভিযোগ সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরাচ্ছে। কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছ মূল্যনীতি নিশ্চিত করা না গেলে বাণিজ্য মেলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।





