‘পুলিশ’ পরিচয়ে বড় ভাইয়ের চাকরি করলেন ছোট ভাই

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:০৩ অপরাহ্ন, ০২ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৩ অপরাহ্ন, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

‘পুলিশ’ পরিচয়ে বড় ভাইয়ের চাকরি করলেন ছোট ভাই। বেতন-ভাতা নিয়েছেন। প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। রেশন খেয়েছেন। অবসরজনিত সকল আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে স্বেচ্ছায় অবসরেও চলে গেছেন। অথচ দেশের ‘দক্ষ’ পুলিশ প্রশাসন তার টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। 

ঘটনা রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার সোনাপুর গ্রামের। দুই ভাই-মো. নাছির আহমদ ও মো. সৈয়দ আহমদ। তাদের বাবা নূর এলাহী ভূইয়াও ছিলেন পুলিশ।

আরও পড়ুন: গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জ্বালানি তেল জব্দ, জরিমানা আদায়

জালিয়াতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন চাকরি করার বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের আওতায় তদন্তযোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশপুত্র মো. নাছির আহমদ ঢাকার একটি স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে পুলিশের হাবিলদার পদে আবেদন করেন। তার আবেদন গৃহীত হয় এবং নিয়োগপত্রও জারি করা হয়। কিন্তু নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পরই ঘটে চাঞ্চল্যকর প্রতারণা। বড় ভাই মো. নাছির আহমদের স্থানে ছোট ভাই মো. সৈয়দ আহমদের ছবি সংযুক্ত করা হয়। এরপর বড় ভাইয়ের পরিচয়ে ছোট ভাই সৈয়দ আহমদ হাবিলদার পদে যোগদান করেন। যার ব্যাচ নম্বর-৫০৫১।

আরও পড়ুন: সিলেটে অনির্দিষ্টকালের জন্য পেট্রোল পাম্পে তেল ও সিএনজি বিক্রি বন্ধ

চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি ডিএমপির রাজারবাগ প্রটেকশন শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির পুরো সময়জুড়ে নিয়োগপত্র, বেতন-ভাতা, ব্যাংক হিসাব, রেশন কার্ড- সবকিছুতেই ব্যবহৃত হয় মো. নাছির আহমদের নাম। অথচ বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. সৈয়দ আহমদ। এনালগ যুগে পরিচয় যাচাই দুর্বল থাকায় এ জালিয়াতি বছরের পর বছর ধরা পড়েনি।

ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ চালু হওয়ায় ধরা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় সৈয়দ আহমদের। যে কারণে ২০০৬ সালেই ভুয়া হাবিলদার সৈয়দ আহমদ স্বেচ্ছা অবসরে চলে যান। ভবিষ্যতে জটিলতা এড়াতে পেনশন সুবিধাও বিক্রি করে দেন।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মো. নাছির আহমদের জন্ম তারিখ ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০ সাল এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা মেট্রিক পাস উল্লেখ রয়েছে। নম্বর:৪১৫১৪৯৬৪৫৪। অন্যদিকে মো. সৈয়দ আহমদ নিজের পরিচয়ে জন্ম তারিখ উল্লেখ করেন ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ সাল। নম্বর: ৬৮৫৮২৭৮৩৪১। এ দুটি পৃথক পরিচয়ই জালিয়াতির বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাদশা আলমগীরের সই করা ওয়ারিশ সনদ অনুযায়ী মো. নাছির আহমদ, সৈয়দ আহমদরা  ছয় ভাই ও চার বোন। এরমধ্যে বড় মো. নাছির আহমদ। তার ডাক নাম নেছার আহমদ। তার ছোট ভাই মো. সৈয়দ আহমদ। এ পারিবারিক তথ্যও অভিযোগের ভিত্তিকে শক্তিশালী করছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় একাধিক অপরাধের উপাদান রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে এমন জালিয়াতি চলতে থাকলে তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অপরাধ নয়- প্রশাসনিক ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও নেয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সৈয়দ আহমদের প্রতিবেশী সাইফুল ইসলাম জানান, সোনাপুরের নূর এলাহীও পুলিশে চাকরি করতেন। তার বড় ছেলে মো. নাছির আহমদ। তাকে সবাই নেছার নামেই চিনে। নাছির ওরফে নেছারের ছোট ভাই মো. সৈয়দ আহমদ পুলিশে চাকরি করেছেন। কিন্তু এখন শুনলাম বড় ভাইয়ের নামে চাকরি করেছেন।

সৈয়দ আহমদের ছেলে সোহেল আহমদ বলেন, আমার বাবার ডাক নাম ছিল সৈয়দ আহমদ। আসল নাম ছিল নেছার আহমদ। এ নামেই তিনি চাকরি করেছেন। ২০০৬ সালে অবসরে গেছেন। পেনশনের সুবিধাদি বিক্রি করেছেন। তিনি পড়াশুনা করেছেন পাংশা জজ হাই স্কুলে।

সৈয়দ আহমেদের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো: আকতার হোসেন বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি চাকরি নেয়া, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির নামে সরকারি অর্থ আত্মসাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ফৌজদারি অপরাধ। দুদক আইনে এটি ৪০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের ২ নং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা, ৪২০ সহ প্রযোজ্য ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করবে দুদক।

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে মো. নাছির আহমদ ওরফে নেছার আহমদকে (০১৭৩****৮৯১) কল করা হলে নাছির আহমদ ফোন রিসিভ করেন। চাকরি বিষয়ে প্রশ্ন করামাত্রই রং নম্বর, রং নম্বর বলে ফোন কেটে দেন