দুই মণ ধানে একজন শ্রমিক: বুড়িচংয়ে শ্রমিক সংকটে দিশেহারা কৃষক
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার অধিকাংশ কৃষক বোরো ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন বোনে। মাঠে মাঠে পাকা সোনালী ধানের শীষে দোল খায় সেই স্বপ্ন। কিন্তু বৃষ্টির পানি আর তীব্র শ্রমিক সংকটে সেই স্বপ্নই এখন ম্লান হতে বসেছে।
দুই উপজেলার বড় বড় মাঠে ধান পাকতে শুরু করেছে। কৃষকেরা যখন মনে সুখে ধান ঘরে তোলার পরিকল্পনা আঁকছেন, তখনই শুরু হয় অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। জলাবদ্ধতা আর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পাকা ধান পানির নিচে চলে যাচ্ছে। একদিকে পানির নিচে ফসল, অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় তীব্র শ্রমিক সংকট।
আরও পড়ুন: নাজিরপুরে নানা বাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে দুই ভাইয়ের মৃত্যু
যারা কষ্ট করে ধান কেটে বাড়িতে আনতে পেরেছেন, তারাও সময়মতো শুকাতে না পেরে ঘরেই ধান নষ্ট করছেন। নতুন বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও বুড়িচংয়ের কৃষকের কপালে এখন শুধুই চিন্তার ভাঁজ।
দুই মণ ধানে একদিনের মজুরি
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় ২ কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্পের উদ্বোধন
বর্তমানে এক মণ মোটা ধানের বাজারদর ৮০ থেকে ৯০ টাকা। অর্থাৎ দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিন বেলা খাবার, দু’বেলা বিড়ি-সিগারেট ও নাশতার খরচ।
গত বছর ৯০-১০ টাকায় শ্রমিক মিললেও এবার খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক মনির হোসেন বলেন, “ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।”
ভোর থেকে বাজারে শ্রমিকের ভিড় শুক্রবার ভোর ৫টায় বুড়িচং উপজেলার খাড়াতাইয়া নতুন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে হাতে লাঠি ও কাস্তে নিয়ে লুঙ্গি পরা শত শত শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকের চোখে ঘুমঘুম ভাব। কাজের আশায় অপেক্ষা করছেন তারা।
উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও ময়মনসিংহ থেকে আসা এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছেন। সন্তানের মুখে দু’বেলা ভাত তুলে দিতে তারা ধান কাটার কাজে এসেছেন এই এলাকায়।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির উদ্দিন বলেন, “শরীরে মাংস নাই, শুধু হাড্ডি। পেটের দায়ে আইছি। ১৪০ টাকার কমে কামে যামু না। আর যদি জমিতে হাঁটু পানি-কাঁদা থাকে, তাইলে ১৮০ টাকা দেওয়া লাগব।”
ময়মনসিংহ থেকে আসা শ্রমিক কামাল বলেন, “বউ মারা গেছে। তিনটা পোলাপান। হাড্ডিসার শরীর নিয়া আইছি। ১৮০ টাকা না হইলে পোলাপান কী খাইব।”
শ্রমিকদের ভাষ্য, বাজারে চাল, ডাল, তেল ও সবজির দাম আকাশছোঁয়া। উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে জনপ্রতি গাড়িভাড়া লাগে ৯০ থেকে ১০ টাকা। ঝড়-বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমেছে, কাঁদা-পানিতে কাজ করা কষ্টকর, অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। তাই মজুরি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
যন্ত্রপাতি বাড়ানোর দাবি কৃষি কর্মকর্তার বুড়িচং উপজেলা কৃষি অফিসার আফরিনা আক্তার বলেন, “কৃষি শ্রমিক সংকটের জন্য সরকারকে আরও ভর্তুকি দিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বুড়িচংয়ের অনেক জমি নিচু। তাই কাঁদা মাটি ও নিচু জমিতে চালানোর মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রদান করতে হবে। তাহলে কৃষি শ্রমিক সংকট লাঘব হবে।
কৃষকরা বলছেন, সরকার যদি দ্রুত যন্ত্রপাতি সহায়তা না দেয়, তবে এবার বোরো মৌসুমে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।





