সীমান্ত সাংবাদিকতার ব্যবচ্ছেদ: আবেগ বনাম বস্তুনিষ্ঠতা

Sanchoy Biswas
সাঈফ ইবনে রফিক
প্রকাশিত: ৮:০৯ অপরাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪১ অপরাহ্ন, ১৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সীমান্তে যখন কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, তখন জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা কেবল তথ্য প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা জনমত গঠন, রাষ্ট্রীয় নীতি প্রভাবিত করা এবং নিরাপত্তা বাহিনী সম্পর্কে সামাজিক ধারণা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কসবা সীমান্তে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোর কাভারেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির চেয়ে আবেগীয় পরিচয়, মানবিক ট্র্যাজেডি এবং রাষ্ট্রীয় ভাষ্যকে “সন্দেহজনক” হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো truth and accuracy বা সত্য ও নির্ভুলতা। অর্থাৎ, কোনো তথ্যকে শুধু আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং বহুমাত্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা। কিন্তু সীমান্তসংক্রান্ত সংবাদে বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম প্রায়ই মানবিক আবেগকে তথ্যের ওপর প্রাধান্য দেয়। এর ফলে ঘটনাটির পূর্ণ বাস্তবতা পাঠকের সামনে আসে না; বরং একটি আংশিক নৈতিক ফ্রেম তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: ইলিশের ঘরবাড়ি

শিরোনামের রাজনীতি ও পরিচয়ের প্রাধান্য

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এই ঘটনার শিরোনাম নির্ধারণে যে কৌশল নিয়েছে, তা সরাসরি জনসহানুভূতি তৈরির সহায়ক। প্রথম আলো নিহত মুরসালিনকে সরাসরি কলেজশিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। একইভাবে দ্য ডেইলি স্টার তাদের প্রতিবেদনে পারিবারিক সূত্রের বরাতে তার ছাত্র পরিচয় এবং “বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল” ধরনের বয়ানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সাংবাদিকতার ভাষায় একে বলা হয় framing effect। অর্থাৎ, কোন পরিচয়টিকে সামনে আনা হচ্ছে, সেটিই পাঠকের নৈতিক অবস্থান নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।

আরও পড়ুন: অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার নতুন চিন্তা, কর আদায় থেকে সম্পদ সৃষ্টির পথে

কিন্তু সাংবাদিকতার আরেকটি মৌলিক নীতি হলো contextual truth বা প্রাসঙ্গিক সত্য। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে ছাত্র, পরিবারের সদস্য এবং সীমান্ত অপরাধে জড়িতও হতে পারেন। সংবাদ যদি কেবল তার শিক্ষার্থী পরিচয়টিকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়, তবে সেটি পূর্ণাঙ্গ সত্য নয়; বরং আবেগনির্ভর আংশিক সত্যে পরিণত হয়।

চোরাচালান: সত্য নাকি কেবল রাষ্ট্রীয় ‘দাবি’?

সীমান্ত সাংবাদিকতায় বাংলাদেশি মিডিয়ার একটি বড় দুর্বলতা হলো অপরাধসংক্রান্ত তথ্যকে প্রায়শই সন্দেহাত্মক ভাষায় উপস্থাপন করা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন মূলধারার সংবাদমাধ্যম চোরাচালানের তথ্যকে “বাহিনীর দাবি” বা “সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে” ধরনের বয়ানে প্রকাশ করেছে। অথচ একই প্রতিবেদনে নিহতদের সীমান্ত অতিক্রমের অবস্থান, রাতের সময়, পূর্ব সম্পৃক্ততা কিংবা স্থানীয় সূত্রের নানা তথ্যও উঠে এসেছে।

এখানে সাংবাদিকতার verification principle বা যাচাই নীতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো তথ্যকে সত্য মনে না হয়, তাহলে সাংবাদিকের দায়িত্ব সেটি স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করা। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত সাংবাদিকতার বড় সংকট হলো, এখানে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন অনুসন্ধানের জায়গাটি অনুপস্থিত। ফলে সংবাদ হয় দুই মেরুর মধ্যে বন্দী: একদিকে রাষ্ট্রীয় ভাষ্য, অন্যদিকে আবেগীয় মানবিক বয়ান। মাঝখানে অনুসন্ধানভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রায় অনুপস্থিত।

মানবিক ট্র্যাজেডি বনাম অপরাধ অর্থনীতি

সাংবাদিকতার একটি বড় শক্তি হলো মানবিক গল্প তুলে আনা। কিন্তু মানবিকতা কখনোই বাস্তবতাকে আড়াল করার হাতিয়ার হতে পারে না। দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো নিহতের পরিবারের কান্না, বাবার বক্তব্য এবং সামাজিক ট্র্যাজেডিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্ব ছিল এই প্রশ্ন তোলা: কেন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের তরুণেরা বারবার চোরাচালানচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে? এই সিন্ডিকেট কারা নিয়ন্ত্রণ করে? স্থানীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সীমান্ত অপরাধের নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করে?

বাংলাদেশি সীমান্ত সাংবাদিকতা প্রায়ই ঘটনাকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক করে তোলে, কিন্তু কাঠামোগত অপরাধ অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করে না। ফলে পাঠক সীমান্তকে কেবল “নিরীহ মানুষ বনাম নির্মম বাহিনী” এই সরল সমীকরণে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় minimise harm এবং seek truth এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলা হয়। অর্থাৎ, মানবিক ক্ষতিকে সম্মান জানাতে হবে, কিন্তু সত্যকে আড়াল করে নয়। সীমান্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি মিডিয়া অনেক সময় প্রথম নীতিটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে দ্বিতীয় নীতিটিকে দুর্বল করে ফেলে।

পরিশেষে, কসবা সীমান্তের ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সীমান্ত সাংবাদিকতা কেবল লাশের সংখ্যা গণনা বা পরিচয়ের আবেগ তৈরির বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে অপরাধতত্ত্ব, ভূরাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং নৈতিক সাংবাদিকতার একটি জটিল ক্ষেত্র। আবেগীয় জাতীয়তাবাদ হয়তো তাৎক্ষণিক জনসমর্থন তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। সীমান্তের সংবাদকে আরও বস্তুনিষ্ঠ, অনুসন্ধাননির্ভর এবং প্রাসঙ্গিক বাস্তবতাভিত্তিক করার বিকল্প নেই।