শুধু মতামত নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, নেতৃত্ব ও কর্ম

Sadek Ali
এম. এ. মতিন
প্রকাশিত: ২:৫০ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪০ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতিটি প্রজন্মেই জাতিগুলো এমন কিছু সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হয়, যা নির্ধারণ করে দেয় তারা শক্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাবে, নাকি বিভাজন, অস্থিরতা ও ব্যর্থতার চক্রে আটকে থাকবে। আজ বাংলাদেশও তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, মানবসম্পদ, সৃজনশীলতা ও উদ্যম থাকা সত্ত্বেও দেশ এখনও রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, নীতিগত অস্থিরতা এবং নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার মতো সংকটে ভুগছে।

এমন সময়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যাচ্ছে অন্তহীন বিতর্ক, আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া ও উপরিভাগের সক্রিয়তায়, তখন বাংলাদেশের শুধু আরও বেশি মতামত প্রয়োজন নয়। প্রয়োজন সচেতন কণ্ঠস্বর, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, নাগরিক সচেতনতা এবং বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রম। শুধুমাত্র স্লোগান, অনলাইন বিতর্ক বা অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না। সেটি গড়ে ওঠে শিক্ষিত, সচেতন ও দক্ষ তরুণ নাগরিকদের মাধ্যমে, যারা নীতি, সুশাসন, জাতীয় স্বার্থ এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে বেকারত্বের ‘নীরব বিস্ফোরণ’: প্রবৃদ্ধির আড়ালে কর্মসংস্থানের গভীর সংকট

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। লাখো তরুণ-তরুণী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। তারা প্রযুক্তিনির্ভর, বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত এবং দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থবহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো অনেক তরুণের অংশগ্রহণ সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তরুণদের ভূমিকা নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রচারণা, দলীয় মবিলাইজেশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এটি যে কোনো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বাস্তবতা। যখন তরুণদের সমালোচনামূলক চিন্তা না শিখিয়ে কেবল রাজনৈতিক বয়ান অনুসরণ করতে উৎসাহিত করা হয়, তখন দেশ দূরদর্শী নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ হারায়। প্রকৃত জাতীয় অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এমন তরুণ, যারা সমস্যাকে বিশ্লেষণ করতে পারে, সমাধানের প্রস্তাব দিতে পারে, গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নিতে পারে এবং মতাদর্শগত পার্থক্য অতিক্রম করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কাজ করতে পারে।

আরও পড়ুন: সমৃদ্ধি নাকি অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের বর্তমান সংকটগুলো কোনো গোপন বিষয় নয়। দেশ আজ বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, পরিবেশ দূষণ, যানজট, শিক্ষাগত বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, সাইবার নিরাপত্তাহীনতা এবং সুশাসনের দুর্বলতার মতো জটিল সমস্যার মুখোমুখি। এসব সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র আবেগঘন বক্তৃতা দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক নীতি পরিকল্পনা, গবেষণানির্ভর সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল।

দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের জনপরিসরে নীতির চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আলোচনা বেশি গুরুত্ব পায়। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমেই সমাধানমুখী হওয়ার পরিবর্তে সংঘাতনির্ভর হয়ে উঠছে। জনগণকে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা দাবি করার পরিবর্তে পক্ষ বেছে নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আর যুক্তিনির্ভর আলোচনা ক্রমেই দুর্লভ হয়ে যায়।

এই কারণেই নাগরিক শিক্ষা ও সচেতন নেতৃত্ব এখন অত্যন্ত জরুরি। নাগরিক সচেতনতা মানুষকে তার সাংবিধানিক অধিকার, দায়িত্ব, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন এবং জনজবাবদিহিতার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। একটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমাজ অন্ধ সমর্থনের সমাজ নয়; বরং সেটি এমন সমাজ, যা প্রশ্ন করে, মূল্যায়ন করে এবং দায়িত্বশীলভাবে জাতীয় উন্নয়নে অংশ নেয়।

বাংলাদেশে তরুণ নেতৃত্বাধীন নীতি প্ল্যাটফর্ম ও নাগরিক সংগঠনগুলো তাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এসব উদ্যোগ এমন একটি পরিসর তৈরি করতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীরা শিক্ষা সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নারীর ক্ষমতায়ন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের মতো বাস্তব জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উদ্যোগ নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কমাতে সহায়তা করতে পারে।

নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পরিবর্তন প্রয়োজন। নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা বা প্রভাবের বিষয় নয়। প্রকৃত নেতৃত্ব মানে সেবা, সততা, ত্যাগ, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা। একজন সত্যিকারের নেতা রাজনৈতিক লাভের জন্য মানুষকে বিভক্ত করেন না; বরং জাতীয় অগ্রগতির জন্য ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি মানুষের আবেগকে শোষণ করেন না; বরং তাদের শিক্ষিত ও ক্ষমতায়িত করেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক তরুণ বিষাক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংঘাতমুখী ভাষার মধ্যে বড় হয়ে উঠছে। ফলে তারা হয় চরমপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে, নয়তো সম্পূর্ণভাবে নাগরিক অংশগ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। গণতন্ত্রের জন্য দুটি পরিস্থিতিই ক্ষতিকর। এর সমাধান হলো এমন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা নৈতিক, সচেতন, দূরদর্শী এবং দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় কল্যাণকে প্রাধান্য দেবে।

এই পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ডিগ্রিধারী নয়, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করবে এবং এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। বিতর্ক ক্লাব, নীতি আলোচনা ফোরাম, গবেষণা দল, যুব কাউন্সিল ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। শিক্ষার্থীদের জানতে হবে রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, নীতিমালা কীভাবে সমাজকে প্রভাবিত করে এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও আজ বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান প্রজন্ম বৈশ্বিক জ্ঞান অর্জন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং সমন্বিত উদ্ভাবনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দায়িত্বশীল ডিজিটাল সক্রিয়তা সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার,যেমন ভুয়া তথ্য, ঘৃণা, অপপ্রচার বা অনলাইন হয়রানি বা সমাজের ঐক্য ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক সম্পৃক্ততা। জাতীয় উন্নয়ন শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নাগরিকদেরও স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণরা পরিবেশ রক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষা সহায়তা, রক্তদান কার্যক্রম, সচেতনতামূলক প্রচারণা, দুর্যোগ সহায়তা ও সামাজিক উদ্যোক্তা উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড নাগরিক দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী করে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাস্তব সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণদের কেবল ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে নয়, বর্তমানের অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, জলবায়ু, নগর পরিকল্পনা ও সুশাসন নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর জাতীয় পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজের উচিত তরুণদের মতামত ও প্রতিনিধিত্বের আরও সুযোগ তৈরি করা।

একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক শত্রুতা ও আদর্শগত ঘৃণার অন্তহীন চক্রে আটকে থাকলে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা সফল হবে না। গণতন্ত্রে গঠনমূলক সমালোচনা অপরিহার্য, কিন্তু ধ্বংসাত্মক বিভাজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। তরুণ নেতৃত্বকে আবেগনির্ভর উগ্রতার পরিবর্তে সংলাপ, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করবে মানবসম্পদের মানের ওপর। বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশকে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে। তরুণদের শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নেতৃত্বের সক্ষমতা, নৈতিক মূল্যবোধ, অভিযোজন ক্ষমতা এবং নাগরিক সচেতনতা দিয়েও প্রস্তুত করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিজেই আমাদের সমষ্টিগত দায়িত্ব ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব শেখায়। বাংলাদেশ কোনো নিষ্ক্রিয়তা বা স্বার্থপরতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি। এটি গড়ে উঠেছে ত্যাগ, সাহস, ঐক্য এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক মর্যাদাপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন নিয়ে। সেই চেতনাকে রক্ষা করতে হলে প্রতিটি প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব ও সচেতন নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে।

সবশেষে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না কে সবচেয়ে জোরে কথা বলে, কে বেশি স্লোগান দেয়, কিংবা কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তাদের দ্বারা, যারা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে পারে, দায়িত্বশীলভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে, সততার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং দেশকে আন্তরিকভাবে সেবা করতে পারে।

বাংলাদেশের শুধু মতামত নয়, আরও অনেক কিছু প্রয়োজন। প্রয়োজন এমন সচেতন কণ্ঠস্বর, যারা অপপ্রচারের চেয়ে সত্যকে মূল্য দেয়। প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা ক্ষমতার চেয়ে মানুষকে অগ্রাধিকার দেয়। প্রয়োজন এমন নাগরিক উদ্যোগ, যা হতাশাকে গঠনমূলক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম, যারা শুধু সমস্যার অভিযোগ করবে না, বরং সমাধান তৈরির দায়িত্বও গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশের তরুণদের হাতেই একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার ক্ষমতা রয়েছে। এখন প্রশ্ন আর এই নয় যে পরিবর্তন প্রয়োজন কি না। প্রশ্ন হলো যে, পরবর্তী প্রজন্ম সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে জ্ঞান, সাহস ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রস্তুত কি না।