ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোচিং সিন্ডিকেটের অভিযোগ, শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ

ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান উপেক্ষা করে একশ্রেণির শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মান দিন দিন নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান দুর্বল হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যারা এসব কোচিংয়ে অংশ নেয় না, তারা শিক্ষকদের অবহেলা ও বিরূপ আচরণের শিকার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে করে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় সড়কে অবৈধভাবে বালু রেখে জনদুর্ভোগ, ১ লাখ টাকা জরিমানা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান পরিচালিত হওয়া এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একসময় প্রায় ২ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৭৫ জনে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৪০ জন শিক্ষক। অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থার নানা অব্যবস্থাপনা এবং পাঠদানে শৃঙ্খলার অভাবের কারণেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু শিক্ষক বিদ্যালয়ের নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের চেয়ে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যে অধিক সময় ব্যয় করছেন। ফলে নিয়মিত ক্লাস গ্রহণে অনীহা দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিজেদের সুবিধামতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোচিং বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং সৃষ্টি হয়েছে, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: নান্দাইলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ লাঘবে শুরু হলো সড়কের সংস্কারকাজ

একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানায়, প্রাইভেট বা কোচিং না করলে অনেক শিক্ষক তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেন না। এমনকি কেউ কেউ দুর্ব্যবহারও করেন। ফলে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ ও শিক্ষাগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, যারা কোচিং করে তাদের প্রতি শিক্ষকদের আগ্রহ বেশি, আর যারা পারে না তারা পিছিয়ে পড়ছে।

শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, নিয়মিত ও কার্যকর ক্লাস না হওয়ায় অনেকেই বিদ্যালয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার বাড়ি ফিরে আসে। কেউ কেউ বিদ্যালয়ে না গিয়ে বাসায় বসেই পড়াশোনা করছে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে।

অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। তারা দাবি করেন, কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্যের বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সমস্যাগুলো দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। কিছু অভিভাবক অভিযোগ করেন, সরকারি পাঠ্যবই বিতরণ নিয়েও অনিয়ম রয়েছে। তাদের দাবি, কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় বই না পেলেও বাইরে বই বিক্রির অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্রীড়া অনুষ্ঠানের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও প্রতিশ্রুত পুরস্কার দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিভাবক রিনা ইসলাম বলেন, “শিক্ষকরা যদি পাঠদানের চেয়ে কোচিং বাণিজ্যে বেশি মনোযোগ দেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।”

আরেক অভিভাবক টিপু মিয়া বলেন, “বিদ্যালয়ে গিয়ে সন্তানরা কী শিখছে, তা অনেক সময় বলতে পারে না। নিয়মিত ও কার্যকর ক্লাস না হলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হবে।”

অভিভাবক আলতাব হোসেন বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক উন্নয়নে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। কোচিংনির্ভরতা কমিয়ে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির বলেন, কোচিং বা প্রাইভেট থেকে কোনো ধরনের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করলে বা জোরপূর্বক কোচিংয়ে অংশ নিতে বাধ্য করলে প্রমাণসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রূপগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিক নূরে আলম বলেন, “প্রতিষ্ঠানটিতে কিছু শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেট কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনকে ক্লাস টিচারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়নে যোগ্য ও কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব সংকট নিরসনে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিদ্যালয়কে একটি সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার কেবল শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই ভুলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।