কাপাসিয়ায় টাকার বিনিময়ে কতিপয় শিক্ষক দিয়ে মানববন্ধন

দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অভিনব চেষ্টা

Sanchoy Biswas
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৪৩ অপরাহ্ন, ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৬ অপরাহ্ন, ২৯ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচতে কাপাসিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অভিনব চেষ্টায় সমালোচনার ঝড় বইছে। সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে কতিপয় শিক্ষক দিয়ে মানববন্ধন করিয়েছেন ফ্যাসিবাদের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রমিতা ইসলাম।

কাপাসিয়া উপজেলায় প্রায় ১৪শ প্রাথমিক শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে ফ্যাসিবাদের দোসর ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষক দিয়ে আজ বুধবার কাপাসিয়া শিক্ষা অফিসের সামনে মানববন্ধন করান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর কাছের কয়েকজন শিক্ষককে দিয়ে গত দুই দিন ধরে মানববন্ধনের চেষ্টা করেন। টাকা খরচ করে চেষ্টা করেও বেশিরভাগ শিক্ষককে আনতে পারেননি তিনি।

আরও পড়ুন: দাগনভূঞায় ইয়াবাসহ যুবক আটক

একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, আমরা কেন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দুর্নীতির ভাগিদার হব? এছাড়া সরকারি চাকরিজীবী হয়ে আমরা তো কোনো কর্মকর্তার জন্য রাজপথে দাঁড়াতে পারি না, এটি আইনেরও লঙ্ঘন। আমরা বেআইনিভাবে দালালি করতে মানববন্ধনে যেতে পারি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, পরীক্ষার ফি নেওয়া সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের তা নিতে বাধ্য করেছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগ শতভাগ সত্য। এ বিষয়ে তিনি তদন্ত দাবি করেন।

আরও পড়ুন: ছাগলনাইয়ায় বিএনপির দুই পক্ষের কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা, শহরজুড়ে কড়া নিরাপত্তা

মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করা শিক্ষকরা হলেন— দীগাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোজাম্মেল হক, দিঘীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও টোক ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, ধরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আজমল হুদা, রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আতিক, ধরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আতিকুল ইসলাম, কাপাসিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাহেলি বেগম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম (কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), ফিরোজ মিয়া (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, তরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), মাহমুদুল (হরিমঞ্জুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়), সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ঘাগটিয়া চালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মরিুজ্জামান, শামসুন্নাহার (সাবেক প্রধান শিক্ষক, সোনারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) এবং নিলুফা (সাবেক প্রধান শিক্ষক, কোড বাজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)।

উল্লেখ্য, ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর কাপাসিয়া উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রমিতা ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সাবেক এমপি সিমিন হোসেন রিমি ও আ ক ম মোজাম্মেল হকের ঘনিষ্ঠ রমিতা ইসলাম কাপাসিয়ায় পোস্টিং পেয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে যাচ্ছেন।

আরও বলা হয়, কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি দেওয়ার কথা নয়। কারণ, সরকারিভাবে প্রতিটি স্কুলে স্লিপ বরাদ্দের মাধ্যমে এ টাকা দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি কাপাসিয়া উপজেলার ১৭৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পরীক্ষার ফি উত্তোলনে বাধ্য করেন। প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিজ নিজ স্কুলে তৈরি করে পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি নিজে সব স্কুলের প্রশ্ন তৈরি করে বিতরণ করে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করেন।

এছাড়াও প্রতিটি স্কুল থেকে গড়ে দুই হাজার টাকা করে পরীক্ষার ফি উত্তোলন করে তিনি নিজে সে টাকা আত্মসাৎ করেন বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসের অডিটের জন্যও শিক্ষকদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায় করে কয়েক লাখ টাকা উত্তোলন করেন তিনি।

শুধু তাই নয়, কাপাসিয়া ডায়াবেটিকস হাসপাতালে সহায়তার নাম করে প্রতিটি শিক্ষকের কাছ থেকে মাসে ৬০ টাকা করে আদায় করে তিনি নিজে আত্মসাৎ করছেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের সারা দেশে একই ড্রেস থাকার সরকারি নির্দেশ থাকলেও তিনি কাপড় কোম্পানির কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে আলাদা ড্রেস বানানোর নির্দেশ দেন। শিক্ষার্থীরাও এ ড্রেস বানাতে বাধ্য হন।

সিলেবাস ছাপানোর বিধান না থাকলেও তিনি নিজে সিলেবাস তৈরি করে ১৭৯টি স্কুলে সরবরাহ দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। ১০০ টাকার মূল্যায়ন রেজিস্টার ৫০০ টাকায় কিনতে বাধ্য করেন তিনি।

অন্যান্য উপজেলার মতো প্রতিটি বিদ্যালয়ের দরিদ্র দপ্তরিদের ঈদ বোনাস দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তাদের ঈদ বোনাস থেকে বঞ্চিত করছেন। এর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে এসব দুর্নীতিতে সহায়তা করছেন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আরিফুল ইসলাম ও লুৎফুন নেছা।