প্রথম দফায় বিক্রি ৬৫ হাজার টাকা

কুমিল্লায় লাউ চাষে চাচা-ভাতিজার সাফল্য

Sadek Ali
মো. মাসুদ রানা, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ৮:৩১ পূর্বাহ্ন, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৩১ পূর্বাহ্ন, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বসতবাড়ির পাশের উঁচু-নিচু ও দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জমিকে কাজে লাগিয়ে হাজারী জাতের উচ্চফলনশীল লাউ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কৃষক চাচা-ভাতিজা কবির হোসেন ও ফারুক মিয়া। কম খরচে অল্প সময়ে ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় তাদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। পাশাপাশি তাদের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের কালিকাপুর দক্ষিণপাড়া ও পাশের জঙ্গলবাড়ি পূর্বপাড়ায় তিন খণ্ড জমিতে এবার কয়েকজন কৃষক হাজারী জাতের লাউ চাষ করেছেন। সব মিলিয়ে চাষের পরিমাণ প্রায় এক একর। এর মধ্যে কৃষক ফারুক মিয়া ২০ শতক এবং কবির হোসেন, দুলাল মিয়া ও সাইফুল ইসলাম মিলে প্রায় ৬০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছেন।

আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ

সরেজমিনে দেখা যায়, ফারুক মিয়ার বাড়ির পূর্ব পাশে তৈরি করা মাচাজুড়ে লাউয়ের গাছ। মাচা থেকে সারি সারি ঝুলছে লম্বা সবুজ লাউ। কোথাও কচি লাউ, আবার কোথাও পরিপক্ব লাউ—পুরো বাগানজুড়েই যেন সবুজের সমারোহ।

কৃষক ফারুক মিয়া জানান, ২০ শতক জমিতে লাউ চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। ফলন শুরু হওয়ার পর প্রথম দিনেই প্রায় ১০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। বর্তমানে আকারভেদে প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাগানে আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার লাউ রয়েছে বলে জানান তিনি। গাছ ভালো থাকলে পরবর্তী সময়ে লাউয়ের পাশাপাশি আগা-ডগা বিক্রি করেও আয় করা সম্ভব।

আরও পড়ুন: মানিকগঞ্জে কালিগঙ্গায় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ: লাখো জনতার ঢল

কৃষক কবির হোসেন জানান, তারা কয়েকজন মিলে প্রায় ৬০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছেন। এতে মোট খরচ হয়েছে আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। প্রথম দফায় প্রায় ৬৫ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন তারা। প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে বাজারজাত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চাচা-ভাতিজাই প্রায় ১০ হাজার টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত লাউ কুমিল্লা শহরেও যাচ্ছে।

তিনি জানান, গত শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে হাজারী লাউয়ের বীজ রোপণ করেন। প্রায় দুই মাস পরিচর্যার পর গাছে ব্যাপক ফলন আসে। লাউয়ের পাশাপাশি বেগুন, করলা, টমেটো ও ধান চাষেও তিনি সফলতা পেয়েছেন।

ফারুক মিয়াও লাউয়ের পাশাপাশি লম্বা বেগুন, শসা, চালকুমড়া ও ঝিঙে চাষ করেছেন। ধান ও ঢেঁড়স চাষেও এলাকায় তার সুনাম রয়েছে।

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক শরিফুর রহমান বলেন, বাড়ির সামনে প্রায় ২০ শতক জমি বছরের বেশিরভাগ সময়ই পরিত্যক্ত পড়ে থাকত। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে ফারুক মিয়া ও তার চাচা কবির হোসেন বিভিন্ন সময়ে সেখানে চাষাবাদ করেছেন। এবার নিজেদের উদ্যোগে হাজারী লাউ চাষ করে তারা ভালো ফলন পেয়েছেন। তাদের দেখাদেখি পাশের গ্রামের সাইফুল ও দুলাল মিয়াও একই পদ্ধতিতে লাউ চাষ করে সফল হয়েছেন।

কৃষকদের এ উদ্যোগকে স্থানীয় পর্যায়ে পরিত্যক্ত জমি ব্যবহারের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বসতবাড়ির আশপাশের অনাবাদি জমিতে মাচা তৈরি করে লাউ ও অন্যান্য সবজি চাষ করা গেলে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোছা. তানজিনা আক্তার জানান, হাজারী লাউ একটি উচ্চফলনশীল জাত। রোপণের ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে চারা হয় এবং প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা যায়। দেখতে আকর্ষণীয়, খেতে সুস্বাদু এবং বাজারে চাহিদা ও ফলন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ জাতের লাউ চাষের আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, লাউয়ের উন্নত চাষে সাধারণত চারা রোপণের ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে প্রথম ফল সংগ্রহ করা যায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে লাউ চাষ করা সম্ভব এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় এর ফলনও ভালো হতে পারে।

কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, লাউ বাগানে জৈব সারের পাশাপাশি সামান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করেছেন। কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। তার দাবি, এ কারণে উৎপাদিত লাউ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় স্থানীয় বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহও রয়েছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা আফরিন আক্তার বলেন, খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি নিরাপদ ফসল উৎপাদনের বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিরাপদ কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে

মাত্র দুই মাসের মধ্যে তুলনামূলক কম খরচে ফলন ও আয় পাওয়ায় খুশি কবির হোসেন ও ফারুক মিয়া। তাদের বাগানের ফলন ও বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার অন্য কৃষকরাও পরিত্যক্ত জমি ফেলে না রেখে সবজি চাষের কথা ভাবছেন।

 বাজারজাতের সুবিধা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে বসতবাড়ির আশপাশের অনাবাদি জমিও পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। বুড়িচংয়ের কালিকাপুর ও জঙ্গলবাড়ির এই চাচা-ভাতিজার লাউ চাষ সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।