উৎপাদন খরচ বেড়েছে বিঘাপ্রতি ১,৮০০–২,০০০ টাকা, ফলন আশানুরূপ
রংপুর অঞ্চলে আগাম আমন ধান কাটা শুরু, শীতকালীন ফসলের প্রস্তুতিতে কৃষক
রংপুর অঞ্চলের উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটার পরপরই জমি প্রস্তুত করে আগাম শীতকালীন শাক-সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। আগাম আমন কাটার কারণে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষকেরা বাড়তি আয় করার পাশাপাশি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারছেন।
তবে সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় চলতি মৌসুমে আগাম আমন ধান চাষে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কৃষকদের হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এবার বিঘাপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও আগাম জাতের আমনের ফলন মোটামুটি আশানুরূপ রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
আরও পড়ুন: বগুড়া জেলখানায় হাজতি আসামির মৃত্যু
কৃষকেরা জানান, সাধারণত নভেম্বরের শুরু থেকে আমন ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়। তবে আগাম জাতের আমন ধান প্রায় এক মাস আগেই, অক্টোবরের প্রথম দিক থেকে কাটা শুরু হয়। বোরো ধান কাটার পর জুনের মাঝামাঝি সময়ে উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়। অক্টোবরের মধ্যে সেই ধান কেটে জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বেগুন, ধনিয়াপাতা, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন আগাম শীতকালীন ফসল চাষ করেন কৃষকেরা। এসব ফসল ঘরে তোলার পর একই জমিতে আবার বোরো ধান চাষ করা হয়।
রংপুরের পাগলাপীর এলাকার কৃষক সুরেশ চন্দ্র বর্মণ (৬৫) জানান, সাধারণত উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন চাষ করা হয়। এসব জমিতে পানি জমে না থাকায় আগাম ধান চাষের জন্য উপযোগী। তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। এর মধ্যে তিন বিঘা জমি থেকে ৪৯ মণ ধান পেয়েছেন। বাকি দুই বিঘা জমির ধান এক সপ্তাহের মধ্যে কাটবেন।
আরও পড়ুন: হরিরামপুরে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত
সুরেশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, আগাম জাতের আমনে সাধারণ আমনের তুলনায় বিঘাপ্রতি দুই থেকে তিন মণ ফলন কম হয়। এবার তাঁর প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ মণ করে ধান হয়েছে। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। গত বছর একই জমিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, “আগাম আমন ধান কাটার পর জমিতে ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শীতকালীন সবজি ঘরে তোলার পর ওই জমিতে বোরো ধান চাষ করব।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান (৫৫) জানান, আগাম আমন ধানের ফলন কিছুটা কম হলেও ধান কাটার পর দ্রুত জমিতে শীতকালীন শাক-সবজি চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করে কৃষকেরা লাভবান হন।
তিনি ছয় বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করে ১০১ মণ ধান পেয়েছেন। তাঁর হিসাবে, এ বছর ছয় বিঘা জমিতে আগাম ধান চাষে খরচ হয়েছে ৮৭ হাজার টাকা। গত বছর একই জমিতে খরচ হয়েছিল ৭১ হাজার টাকা।
আদিলুর রহমান বলেন, আমাদের এলাকায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আগাম জাতের আমন ধান কাটা চলে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন (৬০) বলেন, তাঁদের এলাকায় এক সপ্তাহ আগে থেকে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। অনেক কৃষকই ধান কাটার পর জমিতে আগাম শীতকালীন ফসল চাষ শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, এ বছর আগাম আমন ধানে তেমন রোগবালাই দেখা দেয়নি। ফলনও আশানুরূপ হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের অঙ্ক কমেছে। আমি চার বিঘা জমি থেকে ৬৯ মণ ধান পেয়েছি। এখন জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি লাগাচ্ছি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চর যাত্রাপুরের কৃষক রইছ আলী মণ্ডল (৬০) বলেন, এ বছর ব্রহ্মপুত্রপাড়ে বড় ধরনের বন্যা না হওয়ায় আগাম আমনের তেমন ক্ষতি হয়নি। তাঁরা সাধারণত আগাম জাতের এর ধান চাষ করেন, যাতে ধান কাটার পর দ্রুত শীতকালীন ফসল আবাদ করা যায়।
তিনি বলেন, আমার চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে কাটা শুরু করব। ধান কাটার পর জমিতে শীতকালীন ফসল চাষ করব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে মোট প্রায় ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আগাম জাতের আমন ধান কাটা চলবে। এরপর নভেম্বরের শুরু থেকে পুরোদমে মৌসুমের আমন ধান কাটার কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি বলেন, এ বছর বন্যার প্রভাব তুলনামূলক কম থাকায় আগাম জাতের আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। কৃষকেরা আগাম আমন ধান কাটার পর জমিতে ভুট্টা, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজরসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাক-সবজি চাষ করেন। এতে একই জমিতে দ্রুত পরবর্তী ফসল আবাদ করার সুযোগ তৈরি হয়।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম জাতের আমন ধান চাষ উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর ফসল বিন্যাস। এতে আমন কাটার পর দীর্ঘ সময় জমি পতিত থাকে না। দ্রুত শীতকালীন ফসল আবাদ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকেরা একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারেন। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের ব্যয় কমানো এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আগাম আমন চাষে কৃষকের লাভ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





