কেএনএফ প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৩ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৮ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন এবং এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির অনুসন্ধানে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাইয়ের কাজ বাবদ মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এজাহারভুক্ত অভিযুক্তরা হল: (০১) নাথানা লনচেও @নাথান বম (৪৯), পিতা: মৃত জাওতন লানচেও (দাম্মাদ খ্যেমন বম), মাতা: মৃত রৌকিল বম, সাং- ইডেন পাড়া, ৩ নং ওয়ার্ড, ২ নং রুমা সদর ইউপি, থানা-রুমা, জেলা-বান্দরবান; (০২)  মংহলাসিন মারমা @ মং (৩৮), পিতা: মং চোয়ান্ট মারমা,  মাতা: রুবী চৌধুরী, সাং- গ্রাম-নারানগিরি, ডাকঘর-রাইখালী বাজার, থানা-কাপ্তাই, জেলা-রাঙ্গামাটি; (০৩)  নিয়াজ হায়দার (৩৯), পিতা: নুর বক্স, মাতা: নিলুফার জাহান বেগম, সাং- গ্রাম-দক্ষিণ ভূষি, ডাকঘর-কেলিশহর, উপজেলা-পটিয়া, জেলা-চট্টগ্রাম; (০৪) মো. গোলাম আজম (৪৭), পিতা: মো. আব্বাস উদ্দীন, মাতা: আলেয়া বেগম, সাং-গ্রাম-দৌলতপুর, শিবগঞ্জ পৌরসভা, থানা-শিবগঞ্জ, জেলা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ; (০৫) সাহেদুল ইসলাম (২৭), পিতা: হাবিবুর রহমান, মাতা: রাজিয়া বেগম, সাং- বড়ারবাড়ি, আমিরখীল, ৭ নং ওয়ার্ড, খাগরিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম; (০৬)  মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), পিতা: মুহাম্মদ আব্দুল হান্নান, সাং- লুফি মাদ্রাসা ভবন, আব্দুল হাকিম সওদাগর লেইন, কাপাসগোলা, চকবাজার, কোতয়ালী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম; (০৭)  জামালুল ইসলাম (৪৫), পিতা: এম এ তালুকদার, মাতা: জান্নাতুল ফেরদৌস, সাং- গ্রাম-পূর্ব ফরহাদাবাদ, বিএ সুলতান বাড়ি, ডাকঘর-নাজিরহাট, থানা-ফটিকছড়ি, জেলা-চট্টগ্রাম; (০৮) মো. তৌহিদুল ইসলাম (৩৮), পিতা: মো. সফিউল আলম, মাতা: বিবি আমেনা, সাং- জোহুরুল হক মেম্বার বাড়ি, দক্ষিণ সোনাপাহাড়, জোরারগঞ্জ, মিরসরাই, চট্টগ্রাম এবং (০৯) মো. মতিউর রহমান (৪৩), পিতা: আজিজুর রহমান, মাতা: আম্বিয়া বেগম, সাং- গ্রাম-ব্যাংকান্দা, থানা-লালমনিরহাট সদর, জেলা-লালমনিরহাট।

আরও পড়ুন: মেয়রের ক্ষোভের কয়েক ঘণ্টার পর খুলশী থানার ওসি বদলি

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৮ মে। ওই দিন রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক প্রস্তুতের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে হালিশহর থানাধীন ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানা থেকে মোট ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফের ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম (প্রতি সেটে ০১টি শার্ট ) ০১টি প্যান্ট) জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

পরবর্তীতে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। শুধু ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শনাক্ত নয় বরং ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অর্থ প্রবাহের চিত্র অনুসরণ করে সিআইডি।

আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় ২৪ ঘণ্টায় তিন নারীর মরদেহ উদ্ধার

সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে জানা যায়, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মং প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে নিয়াজ হায়দারের মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন। মংহলাসিন মারমা নিজেকে MI Enterprise এর সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০ নভেম্বর ২০২৪ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।

অনুসন্ধানে আরও পাওয়া যায়, কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের প্যান্ট ও শার্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কুকি-চিনের ৪০ হাজার সেট ৪ রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্মের ফ্যাব্রিক্সের কাজ বাবদ গত ২০/১১/২০২৪ খ্রি. ও ১০/০২/২০২৫ খ্রি. তারিখে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের অনুকূলে দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইউনিফর্ম সেলাই বাবদ রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনকে ৭২ লাখ টাকা প্রদান করেন।

সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের একটি সুস্পষ্ট প্রবাহ শনাক্ত করা হয়েছে। কেএনএফের প্রতিনিধি মংহলাসিন মারমার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থ ব্যবহার করে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ফ্যাব্রিক তৈরির জন্য এবং ৭২ লাখ টাকা ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য প্রদান করা হয়।

সিআইডির অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা/প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্যান্য অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে কেএনএফের জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও অর্থায়ন করে মর্মে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে মর্মে আরও প্রতীয়মান হয়।

এ ঘটনায় সিআইডি বায়েজিদ বোস্তামী থানায়  মামলা নম্বর- ১৩, তারিখ- ০৭/১০/২০২৬ খ্রি.; ধারা- মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) রুজু করে। উক্ত মামলায় আওতায় সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ যোগান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কেএনএফের প্রধান নাথান বম, মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, মো. গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মো. তৌহিদুল ইসলাম এবং মো. মতিউর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মামলাটির তদন্তে সিআইডি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন, অর্থ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এ আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করার লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।