শীতার্তদের সহযোগিতা দয়ার গল্প নয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যর্থতা
বাংলাদেশে শীত কোনো হঠাৎ দুর্যোগ নয়। এটি প্রতিবছর আসে—নিয়মিত, পূর্বানুমেয় এবং নির্দয়ভাবে। তবু প্রতি বছর শীত এলেই আমরা যেন বিস্মিত হয়ে পড়ি। শীতার্ত মানুষের কষ্ট দেখে সাময়িক আবেগে ভেসে উঠি, কিছু কম্বল বিতরণ করি, ছবি তুলি, সংবাদ ছাপাই—তারপর দায় সেরে ফেলি। এই চক্রবদ্ধ উদাসীনতাই প্রমাণ করে, শীত আমাদের জন্য আবহাওয়ার সমস্যা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা।শীতের কষ্ট প্রকৃতির সমানভাবে পড়ে না। এটি আঘাত হানে দরিদ্রের ওপর, শ্রমজীবীর ওপর, ভূমিহীন মানুষের ওপর। শহরের অভিজাত পাড়ায় শীত আরাম বয়ে আনে, আর চর, হাওর, পাহাড় কিংবা ফুটপাতে শীত রূপ নেয় ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া এক নীরব অস্ত্রে। এই বৈষম্য প্রাকৃতিক নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন মডেলের ফল।
প্রশ্ন হলো—যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্প হয়, যেখানে উন্নয়নের গল্প রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক ভাষ্য, সেখানে শীতার্ত মানুষ কেন আজও কম্বলের জন্য হাহাকার করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বাজেট অগ্রাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো ও ক্ষমতার বণ্টনের দিকে তাকাতে হবে।
আরও পড়ুন: মানবিক বাংলাদেশের খোঁজে: নির্বাচন, জনমত ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশই খরচ হয় প্রশাসনিক জটিলতায়, মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। প্রকৃত শীতার্ত মানুষ অনেক সময় তালিকার বাইরেই থেকে যায়। কোথাও কম্বল জমে নষ্ট হয়, কোথাও একটি কম্বলও পৌঁছায় না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; এটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রকাশ।
রাজনীতি যখন নাগরিকের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন দয়া-খয়রাতকে সামনে এনে রাষ্ট্র নিজেকে দায়মুক্ত করতে চায়। শীতবস্ত্র বিতরণকে আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দিই—মঞ্চ, ব্যানার, নেতা, ক্যামেরা। অথচ এসবের আড়ালে চাপা পড়ে যায় মৌলিক প্রশ্ন—কেন এই মানুষগুলো আজও শীতে কাঁপছে?
আরও পড়ুন: গ্যাসহীন শহর, গল্পবাজ রাষ্ট্র আর জিম্মি নাগরিক
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গল্প তখনই অর্থহীন হয়ে পড়ে, যখন সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে নিরাপত্তা আনতে ব্যর্থ হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক—যাদের শ্রমে অর্থনীতি চলে, তারাই শীতের রাতে সবচেয়ে অসুরক্ষিত। এই বৈপরীত্য কাকতালীয় নয়; এটি এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে মুনাফা মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের পাশাপাশি করপোরেট খাতের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) আমাদের দেশে প্রায়ই একটি করছাড়ের কৌশল বা ব্র্যান্ডিং প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যদি সত্যিই সামাজিক দায় হয়, তবে তা মৌসুমি দানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দরকার দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ।
এখানে এনজিও ও দাতব্য সংস্থাগুলোর ভূমিকাও বিশ্লেষণের বাইরে রাখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ভার বহন করছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে একটি বিপজ্জনক প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে—রাষ্ট্র দায় এড়িয়ে যাচ্ছে, আর নাগরিক অধিকার পরিণত হচ্ছে দাতার অনুকম্পায়। এটি গণতন্ত্রের জন্য অশুভ সংকেত।
শীতার্ত মানুষের কষ্টকে আমরা প্রায়ই ‘দুর্ভাগ্য’ বলে ব্যাখ্যা করি। এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। কারণ দুর্ভাগ্য হলে কারও জবাবদিহি থাকে না। কিন্তু সত্য হলো—শীতার্ত মানুষের কষ্ট একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল। যখন রাষ্ট্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার চেয়ে অন্য খাতে অগ্রাধিকার দেয়, তখন এই কষ্ট অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮–২০ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এদের একটি বড় অংশ শীতপ্রবণ অঞ্চল—উত্তরবঙ্গ, চরাঞ্চল, হাওর ও পাহাড়ে কেন্দ্রীভূত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, শীতকাল এলেই নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে। অর্থাৎ শীত এখানে কেবল অস্বস্তি নয়—এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সংকট।
তবু রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি কোথায়? প্রতিবছর শীত শুরুর আগেই কি সরকারিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি হয়? ইউনিয়ন পর্যায়ে কি পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র মজুত থাকে? বাস্তবতা হলো—শীত নামার পর হঠাৎ করে তৎপরতা দেখা যায়, যেন এটি একটি অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অথচ এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পনাহীনতার ফল। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতাও এখানে প্রকট। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা উপজেলা প্রশাসনের হাতে যে সীমিত বরাদ্দ থাকে, তা দিয়ে শীত মোকাবিলা সম্ভব নয়। উপরন্তু রাজনৈতিক আনুগত্য, দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা বণ্টনের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ফলে সবচেয়ে অসহায় মানুষটি—যার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই—সেই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। শীতার্তদের সহায়তায় যে সরকারি ত্রাণ আসে, তার একটি বড় অংশ সময়মতো পৌঁছায় না—এ অভিযোগ নতুন নয়। কোনো কোনো জায়গায় শীত শেষ হওয়ার পর কম্বল আসে; আবার কোথাও গুদামে পড়ে থেকে নষ্ট হয়। এসব ঘটনা প্রশাসনিক অদক্ষতার পাশাপাশি জবাবদিহির অভাবকেই তুলে ধরে। প্রশ্ন হলো—এই ব্যর্থতার দায় কার?
রাষ্ট্র যখন তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে একধরনের ‘উদারতার সংস্কৃতি’ তৈরি হয়—যেখানে দানই মুখ্য, অধিকার নয়। এতে করে সহানুভূতি তৈরি হলেও কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয় না। বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তোলে। শীতার্ত মানুষকে আমরা সাহায্য করি—কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করি না, কেন তারা আজও উষ্ণ পোশাক কেনার সামর্থ্য রাখে না? এখানেই শ্রমবাজার ও ন্যূনতম মজুরির প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশে দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বড় একটি অংশ দৈনিক আয় করে ৫০০ টাকারও কম। এই আয়ে খাদ্য, বাসা ভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর পর শীতবস্ত্র একটি ‘বিলাস’ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ শীতের কষ্ট মূলত একটি আয়-সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এটি সমাধান না করে কম্বল দিয়ে সমস্যার মূল উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শন এখানে নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। উন্নয়ন যদি কেবল অবকাঠামো, সেতু কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা মানবিক উন্নয়ন নয়। প্রকৃত উন্নয়ন মানে—মানুষ যেন শীতে কাঁপে না, চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়, মাথা গোঁজার ঠাঁই পায়। এই মানদণ্ডে বিচার করলে আমাদের উন্নয়ন মডেল গভীর সংকটে রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে শীতপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জন্য ‘উইন্টার অ্যালাউন্স’, গৃহহীনদের জন্য উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র, জ্বালানি ভর্তুকি ও মৌসুমি স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। বাংলাদেশে এসব বিষয়ে নীতিগত আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। শীত মোকাবিলা এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতির অংশ নয়—এটি কেবল একটি মৌসুমি মানবিক উদ্যোগ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আমরা এই ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। প্রতি বছর শীতার্ত মানুষের মৃত্যু সংবাদ হয়, কিন্তু তা জাতীয় আলোচনায় জায়গা পায় না। এটি যেন একধরনের ‘নীরব স্বীকৃত মানবিক ক্ষতি’। রাষ্ট্রের কাছে দরিদ্র মানুষের জীবন এখনও পরিসংখ্যানের বাইরে। শীত তাই আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে নাগরিকের বেঁচে থাকা দয়ার ওপর নির্ভর করবে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে বেঁচে থাকা হবে অধিকার? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, শীত আমাদের কাছে কেবল ঋতু হয়ে থাকবে, নাকি একটি লজ্জাজনক রাজনৈতিক ব্যর্থতার স্মারক হয়ে উঠবে।
এখানে নৈতিকতার প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িত। আমরা যারা উষ্ণ ঘরে বসে উন্নয়নের গল্প শুনি, তারা কি কখনো প্রশ্ন করি—এই উন্নয়ন কার জন্য? নাগরিক হিসেবে এই প্রশ্ন তোলা আমাদের অধিকারই নয়, দায়িত্বও। কারণ নীরবতাও একধরনের সমর্থন। শীত মোকাবিলার সমাধান কেবল কম্বল নয়। সমাধান হলো—বাসস্থানের অধিকার, ন্যূনতম আয় নিশ্চিতকরণ, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা নেট এবং কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। এসব ছাড়া শীত প্রতি বছরই আমাদের মানবিক ব্যর্থতার প্রমাণ হয়ে ফিরে আসবে। শীত তাই কেবল ঋতু নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি একটি অভিযোগপত্র। এই অভিযোগপত্র পড়ে যদি আমরা প্রতিবার চোখ ফিরিয়ে নিই, তবে উন্নয়নের সমস্ত দাবি নৈতিকভাবে শূন্য হয়ে পড়বে।
শীতার্তদের সহযোগিতা যদি সত্যিই মানুষের নৈতিক দায়িত্বে পরিণত হয়, তবে সেটি দয়া নয়—নীতি, অনুকম্পা নয়—অধিকার, মৌসুমি সহানুভূতি নয়—স্থায়ী সামাজিক নিরাপত্তাই হতে হবে লক্ষ্য। অন্যথায় প্রতি শীতেই আমরা নতুন করে প্রমাণ করব—আমাদের উন্নয়ন কাগজে আছে, মানুষের জীবনে নয়। রাষ্ট্রকে সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। নইলে শীত প্রতি বছরই আমাদের মনে করিয়ে দেবে—আমরা এখনও একটি অসম, নিষ্ঠুর ও বিবেকহীন ব্যবস্থার ভেতর বাস করছি। শীতার্তদের সাহায্য যদি শুধু দানের গল্পে সীমাবদ্ধ থেকে থাকে, তাহলে সেটি দেশ কাঠামোতে একটি গভীর নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। কারণ—শীতের প্রভাব, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস্তব চাহিদা, এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা—এইসব বিষয়গুলো শুধুমাত্র মানবিক উদ্যোগ বা অস্থায়ী ডোনেশনে নিষ্পন্ন হয় না; এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট





