রমজানের প্রথম দিনে জমে উঠেছে ইফতারের বাজার
সাধনার মাস রমজানের প্রথম দিনেই রাজধানীর অলিগলিতে জমে উঠেছে বাহারি ইফতারের বাজার। মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি থেকে শুরু করে হালিম, কাবাব এবং নানরুটির সুগন্ধে মুখরিত হয়েছে পাড়া-মহল্লা। সাধ্যের মধ্যে পছন্দের ইফতার কিনতে আসরের পর থেকেই দোকানগুলোতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রতি বছর রমজানে শাহী মসজিদের সামনে বসে বাহারি ইফতারের পসরা। পুরান ঢাকার খ্যাতিমান কফিল বাবুর্চির রান্নার পরম্পরা ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হয় নানা পদ। আয়োজনের আড়ম্বর ও স্বাদের বৈচিত্র্যে লোকমুখে প্রচলিত আছে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।
আরও পড়ুন: রমজানের প্রথম দিনে রাজধানীতে যানজট, ইফতারের আগে গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা
এদিন জমে উঠেছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার ইফতার বাজার। বিকেল গড়াতেই শাহী মসজিদ-এর সামনের গলিগুলো ক্রেতাদের ভিড় দিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের নিয়ে অনেকেই এখানে ইফতার কিনতে এসেছেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি বসেই ইফতার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রথম দিনের আমেজ ছিল উৎসবমুখর, তবে দামের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক ক্রেতা।
এই ইফতার বাজারের ইতিহাসও কয়েকশো বছরের পুরনো। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান এখানে নির্মাণ করেন শাহী মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে একটি আধুনিক বাজারে রূপ দেন। সেই সময় থেকেই রমজান মাসে মসজিদকে ঘিরে বসতে শুরু করে মুখরোচক ইফতারির ভাসমান বাজার। শতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: কম দামের ফাঁদে প্রতারণা, খেজুর ব্যবসায়ীর সন্ত্রাসী আচরণ
কেরানীগঞ্জ থেকে বন্ধুদের নিয়ে ইফতার করতে এসেছেন জাহিদ হাসান। তিনি বলেন, “রোজার মধ্যে চকবাজারে আসা একটা উৎসবের মতো। আমরা প্রায়ই প্রতি রোজায় আসি। আজকেও এখানেই ইফতার করব।”
একইভাবে রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে আসা সাকিব হাসান জানান, “পরিবার নিয়ে বছরে দুই-তিন দিন চকবাজারের ইফতার নেন। মজাদার ইফতার নিয়ে গেলে বাচ্চারা খুব খুশি হয়। তবে এবারে সব আইটেমের দাম একটু বেশি। দামাদামি করেও লাভ হলো না।”
নান-রুটির দোকানগুলোতে ছিল বাড়তি আয়োজন। দুধ নান ৬০ টাকা, গারলিক নান ৭০ টাকা এবং স্পেশাল বাদাম নান ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির লেগ প্রতি পিস ৮০০ টাকা, গরুর সুতি কাবাব কেজি ১,২০০ টাকা এবং খাসির সুতি কাবাব ১,৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ছে আস্ত খাসির কাবাব, যার দাম ১০,০০০ টাকা। বিক্রেতা মো. সালেহ সেটি প্রদর্শনে রেখেছেন। তিনি বলেন, “সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখছে। কিনবেন হয়তো একজন-দুজন।” এছাড়া গরুর কালা ভুনা ১৫০ টাকা প্যাকেট এবং চিকেন তাওয়া ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ইফতার সামগ্রীর মধ্যে কোয়েল পাখির রোস্ট ৮০–৯০ টাকা, চিকেন কাঠি ৫০–৬০ টাকা, মুরগির রোস্ট ৩২০–৩৫০ টাকা প্রতি পিস, চিকেন ললিপপ ৫০ টাকা, কাঠি কাবাব ও চিকেন বল ৬০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, কাঁচামালের দাম বাড়ায় কিছু পণ্যের দামও বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দাম কিছুটা চড়া হলেও প্রথম দিনেই ঐতিহ্যবাহী এই ইফতার বাজারে বেচাকেনা জমজমাট।
রাজধানীর বনশ্রী এলাকার অ্যাভিনিউ রোডগুলোতে সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ঐতিহ্যবাহী ইফতার সামগ্রীর পাশাপাশি সেখানে পাওয়া যাচ্ছে জিলাপি, ফিরনি এবং বিভিন্ন পদের ফল।
ইফতার কিনতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা সামিন ইসলাম জানান, “প্রতি বছর এখানে ইফতারের বড় বাজার বসে। বাড়ির কাছেই গ্রিল, কাবাব থেকে শুরু করে হালিম-সবই পাওয়া যায়। আমাদের ইফতারের জন্য দূরে কোথাও যেতে হয় না, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুবিধা।” ফজলুর রহমান নামে আরেক ক্রেতাও সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী আব্দুল হক জানান, “আমরা দীর্ঘ বছর ধরে এখানে ইফতার বিক্রি করছি। ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে দাম যতটা সম্ভব নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। রমজানের প্রথম দিন হিসেবে আজ বিক্রি খারাপ হচ্ছে না।”
শুধু বনশ্রী নয়, খিলগাঁও, রামপুরা, শাহজাহানপুর ও মগবাজারসহ রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় একইভাবে বসেছে ইফতারের পসরা। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই নিজের সাধ্য ও পছন্দ অনুযায়ী ইফতার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে হালিম ও জিলাপির দোকানে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।





