রমনায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ-বর্ষবরণ

Any Akter
সফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২:২৩ অপরাহ্ন, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৬:১৭ অপরাহ্ন, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

১৪৩২ বঙ্গাব্দের প্রথম ভোরে রাজধানীর রমনা পার্কে উৎসবের ঢেউ লেগেছে। বরাবরের মতো ছায়ানটের আয়োজনে ভোরের আলো ফুটতেই ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ প্রতিপাদ্যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এদিন নারী-পুরুষের লাল-সাদা পোশাকের বাঙালিয়ানা সাজ এবং মানুষের ঢলে পুরো রমনা এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠে। পহেলা বৈশাখে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্মের কাঠিন্য ভেদ করে জেগে উঠেছে বাঙালি হৃদয়। পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাতে রাজধানীর রমনা উদ্যানের সবুজ চাদরে লেগেছে প্রাণের ঢেউ। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে। এককথায় বলতে গেলে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর রমনা পার্কে ভিড় জমেছে মানুষের। 

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোর থেকেই নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে মানুষের ঢলে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পুরো রমনা পার্ক।

আরও পড়ুন: উৎসবমুখর আয়োজনে ঢাবিতে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা ১৪৩৩’ সম্পন্ন

লাল-সাদা পোশাকে সেজেছে নারী-পুরুষ: পহেলা বৈশাখের বিশেষ দিনে নারী-পুরুষ সবাই সেজেছে লাল-সাদা পোশাকে। নারীদের পরনে লাল-সাদা শাড়ি, আর পুরুষদের পাঞ্জাবি। মাথায় ফুলের শোভা যোগ করেছে এক ভিন্ন মাত্রা। ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উৎসবে একাত্ম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা হক এসেছেন মিরপুর থেকে। তিনি বলেন, আমি বন্ধুদের সঙ্গে এসেছি নববর্ষ উদযাপন করতে। আমার মা, খালামনি, বড়বোন, ভাগ্নিও এসেছে। সবাই একসঙ্গে দারুণ সময় কাটাচ্ছি। আব্দুস সোবহান বলেন, ঢাকা আসলে এক ভিন্ন জায়গা। এখানে সবাই ব্যস্ত। সবাই মিলে সময় কাটানোর সময় কারো নেই। তাই কোনও উপলক্ষে ছুটি পেলে সবাই একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করি। সেটা যেখানেই হোক।

আজ যেহেতু পহেলা বৈশাখ তাই আমি আমার পরিবার ও আত্মীয়দের নিয়ে এখানে (রমনা) এসেছি। কিছুটা সময় উৎসবের আমেজে কাটানোর জন্য। যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল থেকে স্ত্রী ও দুই বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে রমনায় এসেছেন আসাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাধারণত বছরের অন্য দিনগুলোতে এভাবে ঘোরা হয় না। যেহেতু আজ বিশেষ দিন। রমনার বটমূল দেখার জন্য অনেকদিন ধরে প্লান করছিলাম। আজ পরিবার নিয়ে চলে আসলাম। ভালোই লাগছে এখানে ঘুরেফিরে। আসাদুলের স্ত্রী মোনালিসা জানান, তিনি ঢাকার বাইরে বড় হয়েছেন। রমনা বটমূলের কথা অনেক শুনেছেন। কিন্তু আসার সুযোগ হয়নি। আজ স্বামীর সঙ্গে প্রথম এলেন রমনার বটমূলে। শুধু আসাদুল-মোনালিসা দম্পতি নন, তাদের মতো শত শত দম্পতি, তরুণ-তরুণী ও পরিবার রমনায় ভিড় করেছেন। তাদের অনেকে ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত হন। বৈশাখের গান শোনার জন্যও অনেকেই জড়ো হন বটমূলে। মিরপুর থেকে এসেছেন পল্লব এবং সুমাইয়া দম্পতি। পল্লব জানান, ঢাকা কলেজে পড়ায় রমনায় অনেকবার এসেছেন। কিন্তু পহেলা বৈশাখে কখনো আসেননি। এবারই বৈশাখের প্রথম দিন এসেছেন।

আরও পড়ুন: বৈশাখী শোভাযাত্রা ঘিরে ঢাবিতে কড়া নিরাপত্তা, চারুকলা এলাকায় নজরদারি জোরদার

পল্লব বলেন, আজ ভিন্ন এক রূপ দেখলাম। পুরো এলাকা যেন উৎসবের সাজে সাজানো। রমনা উদ্যানে প্রবেশ মুখ শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পূর্ব দিক এবং মৎস্যভবন এলাকা যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। ফলে এবার নির্বিঘ্নে শাহবাগ থেকে লোকজন রমনায় আসতে পারছেন। পুরো রাস্তা যেনো একটি বৈশাখী মেলা। সাতসকালে নিউ ইস্কাটন থেকে রমনায় আসেন তিন বান্ধবী হিমা, লাবনী, এবং পড়শী। তারা পুরো রমনা ঘুরছেন আর ছবি তুলছেন। লাবনী বলেন, এমন দিন বছরে একবার আসে। কলেজ থাকায় অন্য দিনগুলোতে আসতে পারি না। আজ তিন বান্ধবী এসেছি। ভালোই লাগছে। হিমা বলেন, প্রতি বছর কম-বেশি রমনায় আসি। কিন্তু এবার এসে কেন জানি খুব ভালো লাগছে। এখনো লোকজনের ভিড় বাড়েনি। এ কারণে আমরা এভাবে ছবি তুলতে পারছি। ঘুরতে পারছি। তবে দর্শনার্থীরা জানান, এবারের আয়োজন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল জোরদার।

র‌্যাবের সদস্যরা ওয়াচ টাওয়ার থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, বসানো হয় সিসিটিভি ক্যামেরা। রাফিন এসেছেন পুরান ঢাকা থেকে। তিনি বলেন, আজকের দিনটিতে রমনায় এসে খুব ভালো লাগছে। এমন সবুজ পার্ক তো ঢাকায় কম। বিশেষ করে পুরান ঢাকায়। ফলে বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে আসলাম। সকাল ১১টার দিকে ডিএমপির সদস্যদের ঘোড়ায় টহল দিতে দেখা যায়। পরে ঘোড়াগুলো পুলিশের কন্ট্রোল রুমের পাশে রাখা হলে তা ঘিরে ভিড় জমে। অনেকেই জানান, টেলিভিশন ও পত্রিকায় রমনার বৈশাখী আয়োজন দেখে অভ্যস্ত ছিলেন। এবার সরাসরি এসে সেই ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরে তারা আনন্দিত।

খেলায় মেতেছে শিশুরা: সপ্তর্ষি পড়ে ক্লাস সেভেনে। সে এসেছে তার মা, নানু, খালামনির সঙ্গে নতুন বছর উদযাপনে। সপ্তর্ষি বলেন, পহেলা বৈশাখে এখানে আসতে খুবই ভালো লাগে। প্রতি বছরই আমি আসি আম্মু, মামা বা খামনিদের সঙ্গে। চারুকলায় যাই আমরা। বড় বড় মুখোশ দেখি, ভাস্কর্য দেখি। এগুলো দেখতে আমার অনেক ভালো লাগে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে ঐতিহ্যবাহী এই বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন করে আসছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।