ঈদযাত্রায় নদীপথে কড়া নজরদারি
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত হলে লঞ্চ এখনও স্বস্তির ভ্রমণ
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের নদীপথে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের চাপ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো যাত্রীর জন্য এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম লঞ্চ। তবে প্রতি বছর ঈদ মৌসুম এলেই অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ভাড়া নৈরাজ্য, ঘাটে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ে। এবার সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগেভাগেই মাঠে নেমেছে সরকার, নৌ-পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে নদীপথ এখনও দেশের অন্যতম আরামদায়ক, কম ঝুঁকিপূর্ণ ও সময় সাশ্রয়ী যাত্রা মাধ্যম।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, এবারের ঈদযাত্রায় নদীপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারেন। এই বিশাল চাপ সামাল দিতে প্রায় ১৭৫টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত চলাচলকারী লঞ্চের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু লঞ্চও বিশেষ সার্ভিস হিসেবে পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ত্রুটিপূর্ণ ড্যাপে ঢাকার আবাসন উন্নয়নে স্থবিরতা
নৌ-পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান সম্প্রতি পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট পরিদর্শন শেষে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এবার কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, অতীতে প্রায়ই দেখা গেছে দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলার দায় নিচের সারির কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন থেকে প্রতিটি ওয়ার্কিং স্টেশনের প্রধান কর্মকর্তাকেই জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর পরিষ্কার নির্দেশনা হচ্ছে—যে কোনো অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা কিংবা জটিলতা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট স্থানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেই জবাবদিহি করতে হবে। জনগণের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।”
আরও পড়ুন: রামপুরায় বলাৎকার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার ঘটনায় মূল আসামি গ্রেফতার
তিনি আরও বলেন, সরকার শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চায় না; বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতেই এবার কড়া মনিটরিং করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, পোর্ট অফিস ও সংশ্লিষ্ট ঘাট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে।
ঈদযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘিরেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, ২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত সদরঘাট ও আশপাশের নদীপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। র্যাব, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সদরঘাট এলাকায় চার থেকে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। পাশাপাশি মোবাইল টিম ও ভ্রাম্যমাণ আদালতও মাঠে কাজ করবে। যাত্রী হয়রানি, দালালচক্র, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিংবা অনুমোদনের বাইরে যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
নৌপথে দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্যের বিষয়টি উঠে আসছে। ঈদের সময় অনেক যাত্রী ঝুঁকি নিয়েই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়ে লঞ্চে ওঠেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ঘাট এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হলেও যাত্রীদের সচেতনতা ছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি লঞ্চের ফিটনেস, লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ও নাব্যতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন বা নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ কোনো লঞ্চকে যাত্রী পরিবহনের অনুমতি না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এদিকে নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে নদীপথের ভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করতে মালিকপক্ষকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থা জানিয়েছে, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৮০টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০টি লঞ্চ চলাচল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে।
নদীবেষ্টিত বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, চাঁদপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বহু যাত্রীর কাছে নদীপথ এখনও সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক যোগাযোগ মাধ্যম। সড়কপথের দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তির তুলনায় লঞ্চে তুলনামূলক কম সময়ে যাত্রা করা যায় বলে মনে করেন তারা। বিশেষ করে রাতে যাত্রা করে সকালে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধাও অনেক যাত্রীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা না গেলে এই স্বস্তি সহজেই দুর্ভোগে পরিণত হতে পারে। তাই প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি যাত্রীদেরও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে লঞ্চে ওঠা, ছাদে অবস্থান করা কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাত্রা না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নৌ প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, “আমরা জনগণের সেবক। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ যাত্রার জন্য যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মেনে চললে ঈদযাত্রা ঝুঁকিমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে আমরা চেষ্টা করব ঘরমুখো মানুষকে নিরাপদে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতে।”





