তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ডেঙ্গুর বৈশ্বিক বিস্তার
রাজধানীতে হাজার কোটি টাকার মশক নিধনেও প্রশ্ন
জলবায়ু সংকট, প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগে বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি; দায় নিরূপণ ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, মশক নিয়ন্ত্রণে গত এক দশকে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য মিলছে না। ফলে একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ জনমনে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ওষুধ ছিটানো বা মৌসুমি অভিযান দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর কার্যকর জবাবদিহি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অন্যথায় প্রতিবছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গু নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
আরও পড়ুন: দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে আনসারের টিডিপি অ্যাডভান্সড কোর্স চলমান, অংশ নিচ্ছেন ৮০০ প্রশিক্ষণার্থী
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময় পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে না, সংক্রামক রোগের বিস্তারও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৩২ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এডিস মশার বংশবিস্তার, ভাইরাস বহনের সক্ষমতা এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
আরও পড়ুন: ধানমন্ডিতে চাপাতির মুখে ছিনতাই, তিন পেশাদার ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার
একসময় ডেঙ্গু সীমিত কয়েকটি উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দশকে ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশে এখন এটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, উচ্চ আর্দ্রতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং উষ্ণ শীত—সব মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে এডিস মশা আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় টিকে থাকতে পারছে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করছে।
বাংলাদেশেও সেই বৈশ্বিক সংকটের প্রতিফলন স্পষ্ট। চলতি বছরের ৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। যদিও গত কয়েক বছরের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম, তবুও জুলাই ও আগস্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে এনএস-১ পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগী চিকিৎসার প্রস্তুতির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকর না হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীতে মশক নিধনের বিপুল বাজেট নিয়েও।
সরকারি বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১০ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে শুধু মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেই এক হাজার ৩৭ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বরাদ্দ বেড়ে প্রায় আট গুণ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবুও বাস্তব চিত্র বলছে, রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় এখনও কিউলেক্স ও এডিস মশার প্রকোপ কমেনি। নগরবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত ও কার্যকরভাবে ওষুধ ছিটানো হয় না। অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন মশক নিধন কার্যক্রম দেখা যায় না। আবার কোথাও ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বাজেট বৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং এর ফলাফল কী—এসব বিষয়ে নিয়মিত নিরীক্ষা ও স্বাধীন মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইনগত ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। যদি অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি, নিম্নমানের ওষুধ ক্রয়, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিক, বিভাগীয় এমনকি প্রচলিত আইনে ফৌজদারি দায়ও নিরূপণের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে কেবল পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্ন। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা জরুরি।
তাদের মতে, রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত একই সময়ে সমন্বিতভাবে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নয়, লার্ভা ও ডিম ধ্বংসেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করেছে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সে স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুই সিটি করপোরেশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর পুলিশ, রাজউকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
টাস্কফোর্সের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মাঠপর্যায়ে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা, অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান।
ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে লার্ভা পাওয়ায় নির্মাণাধীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, শাস্তি দেওয়া নয়; জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ নিশ্চিত করাই এসব অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযানে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ কোম্পানি কিংবা সরকারি সংস্থা নিয়মিতভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে, বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থ হচ্ছে অথবা এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন, নির্মাণাধীন প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও আইনগত নজরদারি বাড়ানোরও সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগতাত্ত্বিক তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগে থেকেই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকার ব্যবহার, উন্নত রোগ নজরদারি ব্যবস্থা, আধুনিক ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ফুলের টব, ড্রাম কিংবা যেকোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকলে তা এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ডেঙ্গু আর শুধু একটি মৌসুমি স্বাস্থ্যসমস্যা নয়; এটি এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বহুমাত্রিক সংকট। ফলে এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দায়িত্বে অবহেলার কঠোর জবাবদিহি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অন্যথায় প্রতিবছর বাড়তে থাকা তাপমাত্রা, নগর বিশৃঙ্খলা এবং দুর্বল বাস্তবায়ন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।





