দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের অর্থপাচারের সাম্রাজ্য: সাবেক মন্ত্রী-ব্যাংকারসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান

Shahrier Islam Pallab
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:৩১ অপরাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৬ অপরাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও সাবেক পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতসহ ৭৩ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহতে কয়েকজনের ফ্ল্যাট, বাড়ি ও ভিলার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোল্ডেন ভিসা নিয়েছেন বলেও তথ্য মিলেছে।

অভিযোগের গভীরে যেতে এবার ইউএই সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য ও নথি চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিএসি) আওতায় মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি, লেনদেন, সম্পত্তি ক্রয় এবং ভিসাসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হবে। দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের তদন্তে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য এই আইনি প্রক্রিয়াই ব্যবহৃত হয়।

আরও পড়ুন: সাবেক মন্ত্রী-ব্যাংকারসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান

দুদকের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বিদেশে বাংলাদেশিদের বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির প্রায় এক হাজার সম্পত্তির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি আদালতের নজরেও আসে। এখন নতুন করে ৭৩ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

বিএফআইইউসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য যাচাই: 

আরও পড়ুন: ডাকাতির প্রস্তুতির সময় র‍্যাব সদস্যসহ পাঁচজন গ্রেপ্তার, পিস্তল হ্যান্ড কাফ উদ্ধার

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে তদন্তকারী দল সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। দুদক ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট ৭৩ ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাঁদের অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে তাঁদের আয়, সম্পদ, কর বিবরণী, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, বিদেশযাত্রা এবং অর্থ স্থানান্তরের তথ্যের সঙ্গে দুবাইয়ে থাকা সম্পদের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দুদকের উপপরিচালক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে এবং সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমানকে সদস্য করে গঠিত বিশেষ দল অনুসন্ধানটি পরিচালনা করছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে দুবাইয়ে থাকা সম্পদের কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না, থাকলে সেই অর্থের উৎস কী—এগুলোই এখন অনুসন্ধানের প্রধান বিষয়।

ইউএই সরকারের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া হতে পারে

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এমএলএআরের মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বা তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সম্পত্তির দলিল, ক্রয়মূল্য, মালিকানার ধরন, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি নিবন্ধন, অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড এবং গোল্ডেন ভিসার তথ্য চাওয়া হতে পারে।

এ ছাড়া সম্পত্তি কেনার অর্থ কোন দেশ বা ব্যাংক হিসাব থেকে গেছে, লেনদেনে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা কোম্পানি ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে আয় করা হলে সেই অর্থ কোথায় জমা হয়েছে—এসব বিষয়েও তথ্য চাওয়া হবে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, বিদেশি কর্তৃপক্ষের নথি পাওয়া গেলে অর্থের উৎস ও স্থানান্তরের পথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহতে সম্পদের তথ্য:

তদন্তে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহ এলাকায় ফ্ল্যাট, বাড়ি ও ভিলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দুবাইয়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও আকর্ষণীয় আবাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে এসব এলাকা অন্যতম। সেখানে সম্পত্তির মূল্য সাধারণত বিপুল এবং ক্রয় বা মালিকানার সঙ্গে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন জড়িত থাকে।

দুদকের অনুসন্ধানকারীরা জানতে চাইছেন, এসব সম্পত্তি ব্যক্তিগত নামে কেনা হয়েছে, নাকি কোম্পানি, আত্মীয়স্বজন বা অন্য কোনো প্রতিনিধির নামে রাখা হয়েছে। সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে বেনামি মালিকানা বা করপোরেট কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তাধীন ৭৩ ব্যক্তি: 

তদন্তাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এইচবিএম ইকবাল, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, আহসানুল করিম, আনজুমান আরা শহীদ, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বি খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ ওলিউর রহমান, এসএ খান ইখতেখুরুজ্জামান, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজি মোস্তফা ভূঁইয়া, মনোজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. মাহবুবুল হক সরকার, মো. সেলিম রেজা, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এসইউ আহমেদ, শেহতাজ মুনশি খান, একেএম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, হাসান রেজা মাহিদুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, মোস্তফা আমির ফয়সাল, রিফাত আলী ভূঁইয়া, সালিমুল হক ঈসা/হাকিম মোহাম্মদ ঈসা, সৈয়দ একে আনোয়ারুজ্জামান/সৈয়দ কামরুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, সৈয়দ সাইমুল হক, আবদুল হাই সরকার, আহমেদ সামির পাশা, ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মোহাম্মদ আল রুমান খান, মাইনুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আউয়াল, সাদিক হোসাইন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসাইন, মোহাম্মদ শওকত হোসাইন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসাইন, এমএ হাসেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, সৈয়দ মিজান মোহাম্মদ আবু হানিফ সিদ্দিকী, সায়েদা দুররাক সিন্ডা জারা, আহমেদ ইফফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এমএ সালাম, মো. আলী হোসাইন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভূঁইয়া, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ রোহেন কবির, মঞ্জিলা মুর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সারফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী।

দুদক বলছে, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। অনুসন্ধানের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আদালতের নির্দেশে শুরু হয় ৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পদ অনুসন্ধান

দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের সম্পদ নিয়ে এই অনুসন্ধানের সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনায়। ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন।

সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সিফোরএডিএস) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্যাক্স অবজারভেটরির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির মালিকানায় ৯৭২টি সম্পত্তি ছিল। এসব সম্পত্তির নথিভুক্ত মূল্য প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২ সালের মে মাসে প্রকাশিত সিফোরএডিএসের এক গবেষণায় সম্পত্তিগুলোর মূল্য প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বলা হয়েছিল।

গবেষণায় বলা হয়, এসব সম্পত্তির মধ্যে ৬৪টি দুবাই মেরিনায় এবং ১৯টি পাম জুমেইরাহতে রয়েছে। বাংলাদেশিদের মালিকানায় অন্তত ১০০টি ভিলা ও পাঁচটি ভবনের তথ্যও পাওয়া যায়। এ ছাড়া চার-পাঁচজন বাংলাদেশির সঙ্গে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তির যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।


সম্পদের উৎস নিয়ে বড় প্রশ্ন

দুবাইয়ে সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশে ঘোষিত আয়, ব্যবসা ও কর নথির সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দুদকের অনুসন্ধানে মূলত এই প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা হচ্ছে—সম্পত্তি কেনার অর্থ বৈধ আয় থেকে এসেছে, নাকি ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বা ভুয়া ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থপাচারের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে শুধু বিদেশে সম্পত্তি থাকার তথ্য যথেষ্ট নয়। অর্থের উৎস, স্থানান্তরের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং দেশে-বিদেশে লেনদেনের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে হবে। এ কারণে দেশীয় নথির পাশাপাশি ইউএই কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন করা তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ: 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে অর্থপাচারকারীরা সম্পত্তি বিক্রি, মালিকানা বদল বা অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তাই দ্রুত তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনে সম্পদ জব্দের উদ্যোগ জরুরি।

তাঁরা আরও বলেন, বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, করব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন জড়িত। প্রভাবশালী ব্যক্তি হলেও তদন্তে কোনো ছাড় না দিয়ে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

দুদকের এমএলএআর পাঠানোর উদ্যোগ এখন সেই তদন্তকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউএই সরকারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে দুবাইয়ে থাকা সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং লেনদেনের পথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মিলতে পারে। তবে অনুসন্ধান কত দ্রুত এগোয় এবং সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।