‘গুপ্ত’ নিয়ে উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতি

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১৮ অপরাহ্ন, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৮:১৮ অপরাহ্ন, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পরস্পরকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির পরিচয় নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি সহ দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি ‘গুপ্ত’ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে জাতীয় সংসদেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘গুপ্ত’ নিয়ে এখন মারমুখী উত্তপ্ত পরিবেশ।

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালের গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের পর সেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। এমনকি বিষয়টি নিয়ে হইচই হয় জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও। সর্বশেষ ঢাবিতে ‘গুপ্ত’ দেয়াললিখন ঘিরে শিবির-ছাত্রদলের উত্তেজনা, সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগসহ শিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্র বিস্তৃত করার আহ্বান

তবে ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘুরেফিরে বারবার আলোচনায় এসেছে ‘গুপ্ত’ শব্দটি। এর সূত্র ধরেই গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, গুপ্ত রাজনীতির বলার পর ছাত্রশিবিরের তরফ থেকে কেন প্রতিক্রিয়া আসছে। যদিও ছাত্রসংগঠনটির দাবি, ‘গুপ্ত’ লেখার কারণে তারা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং তাদের ওপর হামলা হওয়ার পরই তারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। একইসাথে দেশ পরিচালনায় বিএনপি সরকারের ব্যর্থতার দায় ঢাকতে এমন বিতর্ক সৃষ্টি করে তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল জনসাধারণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেছে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতা।

এর আগে, জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় এক ভাষণে বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ‘গুপ্ত’ প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, অনেকে এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন, গুপ্ত তোমরা। কারণ, তাদের গত ১৬ বছর আমরা দেখি নাই। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে (৫ই আগস্ট) পালিয়ে গিয়েছে।’

আরও পড়ুন: তিন শর্তে আলোচিত অধ্যাপক সোহেলকে মাঊশির মহাপরিচালক নিয়োগ

তারেক রহমান এই কথা বলার পরদিনই এক জনসভায় জামায়াতের আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, অনেকে আমাদেরকে খোঁচা দেয়। আমরা নাকি গুপ্ত নাকি সুপ্ত। লজ্জা! নিজেরা যারা গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে থেকেছেন, সেই লোক যদি আমাকে গুপ্ত বলেন, আপনাকে গুপ্ত বলে, আপনার কেমন লাগবে বলেন!

এর আগে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর পুরো শিক্ষাঙ্গনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ ঘটনার জেরে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ আজ বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২৪ সালের ডিগ্রি (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

ওই সহিংস ঘটনার জেরে গতকাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও শোডাউন হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এর মাঝে বুধবার চট্টগ্রামে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। অন্যদিকে ওই ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনাকে তারা পরিকল্পিত ও ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেন।

এছাড়া ওই ঘটনার জেরে গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ করে ছাত্রদল। ওই সময়ে ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, একবার গুপ্ত বলায় যদি এত জ্বালা হয়, তাহলে প্রতিটি ক্যাম্পাসে হাজারবার গুপ্ত বলব।

সর্বশেষ বুধবার সংসদের অধিবেশন চলার সময় ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বেশ কয়েকটি হলে ‘গুপ্ত’ দেয়াললিখন ঘিরে ইসলামি ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এদিকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুটি পৃথক ঘটনায় ৬ সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। তবে ছাত্রদল বলছে, সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনাটি নিতান্তই ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে, শিগগিরই দু’পক্ষের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা হবে। এদিকে সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু)।

বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ৭১ ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে দেয়াললিখন ঘিরে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, এইদিন রাতে বিজয় ৭১ হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করতে গেলে শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির তিন সদস্য হেনস্তার শিকার হন। এ সময় প্রাইম বাংলাদেশের ঢাবি প্রতিনিধি ইফতেখার সোহান সিফাতকে ভিডিও করতে বাধা দেন ছাত্রদল কর্মী নাভিদ আনজুম নিভান।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, এসময় ভুক্তভোগী সাংবাদিক সিফাত নিজের সাংবাদিক পরিচয় দিলেও নিভান তাকে ভিডিও ধারণে বাধা দিয়ে বলেন, ‘সাংবাদিক হলেই এখানে ভিডিও করা যাবে না।’ এ সময় সাংবাদিক সমিতির আরো দুই সদস্য— দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান খান ও নয়া দিগন্তের প্রতিনিধি হারুন ইসলাম প্রতিবাদ জানালে তারাও হেনস্তার শিকার হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উপস্থিত ছাত্রদলের সিনিয়র নেতারা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

একই দিন গভীর রাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলেও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আরো সাংবাদিক কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি মানজুর হোসাইন মাহি, ডেইলি অবজারভারের প্রতিনিধি নাইমুর রহমান ইমন এবং সদস্য সজীব আহমেদকে হেনস্তা করা হয়।

হেনস্তার শিকার ডেইলি অবজারভারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইমন বলেন, আমরা তিনজন রুমে গিয়ে হাউজ টিউটরকে পরিচয় দেই। তখন পাশ থেকে একজন বলেন, হলের ইস্যু, বাইরে থেকে কেন আসছে। এরপর কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী আমাদের দিকে তেড়ে আসেন।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় হাউজ টিউটর মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তার সামনেই আমাদের হেনস্তা করা হয় এবং মারধরের চেষ্টা করা হয়।

এদিকে শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সাংবাদিকরা আসছিলেন। যেহেতু শিক্ষার্থীরা তাদের চিনত না, আমার ধারণা, তখন পেছনে থাকা কয়েকজন শাউট করেছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই রাত ৩টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে উপাচার্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল সেক্রেটারি নাহিদুজ্জামান শিপন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমার মনে হয়, এখানে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সাংবাদিক সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা দ্রুতই পারস্পরিক আলোচনায় বসে সমাধান করব।

তবে সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনায় ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ ও সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহাঃ মহিউদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবাদ জানানো হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি সংশ্লিষ্টদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

তবে এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, গ্রাফিতির জবাব গ্রাফিতি এঁকে দেওয়ার কথা ছিল। তা না করে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে ছাত্রশিবির। সিটি কলেজে হামলার ঘটনায় সম্পূর্ণ দায়ভার ছাত্রশিবিরের বলেও দাবি করেছেন তারা।

মূলত গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রশিবিরের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে পরিচয় গোপন করে বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময়ও বিএনপির দলীয় প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখেও গুপ্ত রাজনীতির কথা শোনা গিয়েছিল। যদিও সেসময় তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। পরে তার জবাবও দেন জামায়াতের আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

গত মঙ্গলবার কলেজ ভবনের দেয়ালে লেখা “ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস”-এর ছাত্র শব্দটি কালি দিয়ে মুছে ‘গুপ্ত’ লেখে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সেখান থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে দাবি করে ছাত্রদল। যদিও ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই বক্তব্য আসছে সংঘর্ষে জড়ানো দুই ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে।

ছাত্রশিবিরের দাবি, গুপ্ত লেখা নিয়ে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বরং লেখাটিকে ঘিরে চলমান “মিথ্যাচারকে এনজয়” করছেন বলে দাবি করেছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তার দাবি, সিটি কলেজে টানানো তাদের দলীয় পোস্টার নামিয়ে দেয় ছাত্রদল। এ বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়ে বেরিয়ে আসার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে তাদের হাতাহাতি হয় এবং একজন শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করা হয়। তারপর মূল ফটকের বাইরে বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর আঘাত করা হয়, যার প্রতিবাদে বিকেলে মিছিল বের করলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রদল পেছন থেকে হামলা করে বলে দাবি করেন তিনি।

এমনি ওই লেখা নিয়ে কোনো বিষয় ঘটেনি বলে জানান ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, মুশকিল হচ্ছে আপনি গুপ্ত ডেকে গ্রাফিতি আঁকবেন—নো প্রবলেম। কিন্তু সেখানে শিবিরের আস্তানা ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও বলে স্লোগান দিলে তখনতো আমি রিঅ্যাক্ট করবো।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলছেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি বা দেয়াললিখনে ‘গুপ্ত’ লেখার কারণে ছাত্রশিবির তাদের ওপর হামলা করেছে। হামলার পর ‘সামান্য পরিসরে হাতাহাতির’ ঘটনার সময় শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছিল। পরে অধ্যক্ষের উপস্থিতিতে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হলে তারা চলে যান। এরপর তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেন এই বলে যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নাকি লেজ গুটিয়ে চলে গেছে—এসব অভিযোগ করে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তারা পোস্ট দেয়। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে।

নাছির উদ্দীন বলেন, গুপ্ত লেখার কারণে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন কিংবা বিষয়টি তাদের অপছন্দ হয়ে থাকে, তাহলে তারা আরেকটি গ্রাফিতি আঁকতে পারতো। কিন্তু সেটি না করে তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

তবে ছাত্রশিবিরের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, তারা ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বরং একে ‘স্যাটায়ার’ হিসেবে নেওয়ার কথাও বলেছেন তাদের কেউ কেউ।

এর আগে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট ভাইরাল হয় যেখানে ছাত্রলীগের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদের নাম ছিল। পরে এক সংবাদ সম্মেলন করে এস এম ফরহাদ বলেছিলেন, ছাত্রলীগের কমিটির কিছু প্রক্রিয়া আছে। আমি কখনও সেসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করিনি। কখনও সিভি জমা দিইনি। তবু কেন আমাকে পদ দিলো, সে প্রশ্ন ছাত্রলীগকে করা উচিত। তিনি বলেন, এটারতো কোনো প্রমাণ নাই। আমি কি কোনো কমিটিতে ছিলাম?

ছাত্রদলের বিরোধিতা করার জন্য কোনো আদর্শিক ভিত্তি না থাকায় ‘আগের ছাত্রলীগের মতো তারা দায় দেওয়ার রাজনীতি’ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে ছাত্রদল বলছে, ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ছাত্রশিবির তাদের পরিচয় গোপন রাখার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম তারা প্রকাশ করেনি, বরং পরিচয় গোপন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘বিভ্রান্ত’ করছে। ফলে কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকা সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে আসছে না। একইসাথে নিজেদের স্বার্থও হাসিল করে নিচ্ছে সংগঠনটি।

তবে ছাত্রশিবিরের দাবি, তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে। তবে সংগঠনটির কমিটির ধরন অন্যদের মতো না হওয়ায়, বাকিরা এই বাস্তবতা স্বীকার করে নিচ্ছে না।

সংসদে ‘গুপ্ত’ নিয়ে উত্তেজনা: চট্টগ্রামে ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯তম দিনে বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। হয় ব্যাপক হইচই।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে বলেন, তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে। তিনি চট্টগ্রামের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, চট্টগ্রামের ছাত্রদল কী কথা বলেছে, গুপ্ত বলেছে। এই সংসদে আমরা নির্বাচিত হয়ে আসছি কথা বলার জন্য। বিরোধীদলের ভাইয়েরা আজকে কণ্ঠ চিপে ধরতে চায় ফ্যাসিস্টের মতো। ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করেই সেখানে ছাত্রদলের ওপর হামলা হয়েছে এবং বিরোধীরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি আরও বলেন, সরকারকে নাজেহাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করবে। অতএব, আমি তাদের সবিনয়ে অনুরোধ করব, সরকারকে সাহায্য করুন।

তার বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে স্পিকার বলেন, রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে, তাদের কথাবার্তার সবাই সবটাই পছন্দ হবে এমন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু অনুগ্রহ করে শুনুন, আমার কথাটি শুনুন। এখন আপনাদের একজন বক্তাকে আমি দিচ্ছি। উনি (বিরোধীদলীয় নেতা) যা যা বলেছেন প্রয়োজন হলে আপনারা তার জবাব দিতে পারবেন। বক্তব্যের মাধ্যমে জবাব দেন। একজন বক্তাকে বক্তব্যের সময় অনুগ্রহ করে ডিস্টার্ব করবেন না।

আবদুল ওয়াদুদের বক্তব্যের সময় বিরোধীদলের এমপিরা তীব্র আপত্তি জানান। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, জনগণ বসে থাকবে না মানে কী? তিনি কি উসকিয়ে দিচ্ছেন জনগণকে বিশৃঙ্খলার দিকে? এগুলো সংসদীয় আচরণ না। জনগণকে উসকানি দেওয়ার ভাষা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সংসদীয় শিষ্টাচার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে স্পিকার বলেন, আমরা পরীক্ষা করে দেখব, যদি কোনো অসংসদীয় ভাষা থাকে সেটা আমরা এক্সপাঞ্জ করব। আর দ্বিতীয়ত, এটা তো বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা। আমরা চুপ করে থাকব না, এগুলো তো শত শত বছর ধরে রাজনীতিবিদরা বলে এসেছেন। আপনারা যখন বক্তব্য দেবেন তখন এর জবাব দেবেন।