সালমান শাহকে হারানোর ৩০ বছর, এখনো দর্শকের হৃদয়ে অমর নায়ক

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৪:২৪ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সালমান শাহ। মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্রজীবনেই অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশন দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়। ঢালিউডের এই অমর নায়ককে হারানোর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সালমান শাহ। মৃত্যুর তিন দশক পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের নস্টালজিয়ার অন্যতম বড় নাম। তার সিনেমা মানেই নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিকতা, তারুণ্যের আবেগ এবং দর্শকের ভালোবাসায় ভরা এক স্বর্ণালি অধ্যায়।

আরও পড়ুন: সালমান শাহ স্মরণে শাবনূরের আবেগঘন স্ট্যাটাস

সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকী এলেই রাজধানীর দারিয়া পাড়ায় তার নানার বাড়িতে ভক্তদের আনাগোনা বাড়ে। বর্তমানে ‘সালমান শাহ হাউজ’ নামে পরিচিত এই বাড়িতেই কেটেছে তার শৈশবের একটি বড় সময়। তার মামা কুমকুমের ভাষ্য অনুযায়ী, দুরন্ত শৈশবের অনেকটা সময় এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন সালমান।

মৃত্যুর এত বছর পরও টেলিভিশনে সালমান শাহর সিনেমা প্রচার হলে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়। তার অভিনীত সিনেমার পাশাপাশি গানগুলোও এখনো দর্শকের কাছে সমান জনপ্রিয়। অনেক সময় নতুন সিনেমার সঙ্গে একই সময়ে কোনো চ্যানেলে সালমান শাহর পুরোনো সিনেমা প্রচার হলেও দর্শকের বড় একটি অংশ তার সিনেমার প্রতিই আগ্রহ দেখান। তার অভিনয় ও পর্দায় উপস্থিতির প্রতি দর্শকের এই আকর্ষণই প্রমাণ করে, সময়ের সঙ্গে সালমান শাহর জনপ্রিয়তা ম্লান হয়নি।

আরও পড়ুন: ৯ বছর পেরোলেও কমেনি 'বড় ছেলে' নাটকের জনপ্রিয়তা

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্ম সালমান শাহর। তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। সিলেট শহরের শেখঘাটে তার দাদার বাড়ি এবং দারিয়া পাড়ায় নানার বাড়ি। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ পারিবারিকভাবেও পেয়েছিলেন সালমান শাহ। তার নানা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন।

স্কুলজীবনে বন্ধুমহলে সংগীতশিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন সালমান। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লীগীতিতে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

চলচ্চিত্রে আসার আগেই নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয়জীবনের শুরু। মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘পাথর সময়’-এ গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে প্রশংসা পান।

সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন সালমান শাহ। মৌসুমীর সঙ্গে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। পরে এই জুটি ‘স্নেহ’ ও ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমায়ও অভিনয় করে।

তবে শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর জুটি দর্শকের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়। তাদের জুটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হিসেবে এখনো স্মরণ করা হয়। শাবনূর ছাড়াও শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চির সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ।

অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক ও চুলের স্টাইলেও নব্বইয়ের দশকের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন সালমান শাহ। তার পর্দার পোশাক, চুলের ধরন ও ব্যক্তিত্ব সে সময়ের তরুণদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল।

মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে তিনি এমন একটি অবস্থান তৈরি করেন, যা মৃত্যুর তিন দশক পরও অটুট। পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রে বহু নায়ক এলেও অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশনে সালমান শাহর তৈরি করা জনপ্রিয়তার জায়গাটি কেউ দীর্ঘস্থায়ীভাবে ছাপিয়ে যেতে পারেননি।

১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরা হকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সালমান শাহ। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার আকস্মিক মৃত্যু কোটি ভক্তকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়। সময় পেরিয়েছে ৩০ বছর। প্রজন্ম বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যমও। কিন্তু সালমান শাহর প্রতি দর্শকের ভালোবাসা বদলায়নি। যারা তার সময়ে শিশু বা কিশোর ছিলেন, তাদের স্মৃতিতে তিনি আজও শৈশব-কৈশোরের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সালমান শাহ চলে গেছেন তিন দশক আগে। কিন্তু তার সিনেমা, গান, অভিনয় ও ফ্যাশন এখনো নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সালমান শাহ শুধু একজন প্রয়াত নায়ক নন—তিনি এক দীর্ঘস্থায়ী নস্টালজিয়া, যাকে দর্শক আজও ভালোবাসায় স্মরণ করেন।