আইয়ুব বাচ্চুকে হারানোর ৮ বছর
সময় বয়ে যায়, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ থেকে যায় মানুষের হৃদয়ের গভীরে। কিছু গান হয়ে ওঠে জীবনের গল্প, কখনো প্রেমের, কখনো বিচ্ছেদের, কখনো নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর হাতে ধরা গিটার, দরাজ কণ্ঠ আর মঞ্চ মাতানো উপস্থিতি আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে আট বছর। অথচ তাঁর গান শুনলে আজও মনে হয়, এই তো আছেন তিনি—সুরের ভেতর, অনুভূতির ভেতর, অগণিত শ্রোতার ভালোবাসায়।
আরও পড়ুন: ভাইরাল হওয়ার জন্য কখনো মানহীন কাজ করব না: তাসনুভা তিশা
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সংগীতাঙ্গনে। ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
সংবাদটি ভক্তদের কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। যার গিটারের ঝংকারে কনসার্টের মঞ্চ মুখর হয়ে উঠত, যার কণ্ঠে হাজারো মানুষ একসঙ্গে গেয়ে উঠতেন প্রিয় গান, সেই মানুষটিই আর নতুন কোনো সুর নিয়ে ফিরবেন না—এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল অনেকের জন্য।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের শিল্পী ইমনকে চরম হেনস্তা
তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত হারায় এক অনন্য শিল্পীকে। তবে শিল্পীর শারীরিক অনুপস্থিতি তাঁর সৃষ্টিকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর গান নতুন করে ফিরে এসেছে শ্রোতাদের কাছে।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহই একসময় তাঁকে নিয়ে যায় পেশাদার সংগীতের জগতে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৮০ সালে যোগ দেন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। দীর্ঘ এক দশক এই ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে নিজের কণ্ঠ ও গিটারের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। ব্যান্ডটির নামের অর্থ ‘ভালোবাসা অন্ধ’। এলআরবির মধ্য দিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বাংলা ব্যান্ডসংগীতে তৈরি করেন নিজস্ব এক পরিচয়। তাঁর কণ্ঠ, গিটার বাজানোর ধরন, সুরের বৈচিত্র্য এবং পরিবেশনার শক্তি ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করে।
তিনি শুধু গায়ক ছিলেন না; ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও দক্ষ গিটারবাদকও। নিজের সংগীতভাবনাকে নানা আঙ্গিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। ব্যান্ডের গানের পাশাপাশি একক অ্যালবামেও রেখেছেন সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। তাঁর সংগীতে পাশ্চাত্য রকসংগীতের প্রভাবের সঙ্গে মিশে ছিল বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা।
আইয়ুব বাচ্চুর নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে ‘সেই তুমি’, ‘ফেরারি মন’, ‘এখন অনেক রাত’ কিংবা ‘কষ্ট’-এর মতো গান। গানগুলো শুধু জনপ্রিয় সংগীত হয়ে থাকেনি; শ্রোতাদের ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
কেউ হয়তো প্রিয় মানুষকে হারিয়ে শুনেছেন ‘সেই তুমি’, কেউ নিঃসঙ্গ রাতে খুঁজে পেয়েছেন ‘এখন অনেক রাত’-এর আবহ। আবার কারও কৈশোর কিংবা তারুণ্যের গল্পের সঙ্গে মিশে আছে এলআরবির গান। সময়ের সঙ্গে শ্রোতার বয়স বদলেছে, গান শোনার মাধ্যম বদলেছে। ক্যাসেট থেকে কমপ্যাক্ট ডিস্ক, সেখান থেকে অন্তর্জালের বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছেছে সংগীত। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর গানের আবেদন হারিয়ে যায়নি।
তাঁর গানের বড় শক্তি ছিল অনুভূতির সঙ্গে শ্রোতার সংযোগ তৈরি করা। গানের কথা, সুর আর গিটারের মেলবন্ধনে তিনি এমন এক আবহ তৈরি করতেন, যেখানে শ্রোতা নিজের জীবনের গল্প খুঁজে নিতে পারতেন। সে কারণেই তাঁর গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছেছে।
আইয়ুব বাচ্চুর পরিচয়ের অন্যতম বড় অংশ ছিল তাঁর মঞ্চ পরিবেশনা। গিটার হাতে মঞ্চে উঠলে যেন বদলে যেত পুরো পরিবেশ। তাঁর গিটারের সুর, কণ্ঠের শক্তি এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক আলাদা আবহ।
তাঁর সংগীতজীবন ছিল দীর্ঘ ও পরিশ্রমের। একাধিক প্রজন্মের শ্রোতার সামনে গান গেয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিবেদিত ভক্তসমাজ। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি রংপুরে একটি সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বলে সে সময়ের সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
এই তথ্যটি তাঁর সংগীতের প্রতি ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। গিটার ছিল তাঁর কাছে কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং নিজের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা। শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে মঞ্চকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা শুধু তাঁর জীবদ্দশার সাফল্যে মাপা যায় না; তাঁর সৃষ্টিকে পরবর্তী প্রজন্ম কতটা আপন করে নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি স্পষ্ট। তাঁর গান এখনো মানুষের গানের তালিকায় থাকে, স্মৃতিচারণে ফিরে আসে, সংগীতপ্রেমীদের আলোচনায় জায়গা পায়।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের বিকাশে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষায় রকসংগীত মানুষের আবেগ ও দৈনন্দিন জীবনের কথা বলেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে। তাঁর গিটার বাজানোর স্বতন্ত্র ধরন বহু সংগীতপ্রেমী ও তরুণ গিটারবাদককে অনুপ্রাণিত করেছে।
তাঁর প্রয়াণের পরও তাঁকে স্মরণ করে বিভিন্ন সময়ে সংগীতশিল্পী ও ভক্তরা শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কারণ, আইয়ুব বাচ্চু কেবল কয়েকটি জনপ্রিয় গানের নাম নন; তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আট বছর আগে তাঁর চলে যাওয়া যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা হয়তো কখনোই পুরোপুরি পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু সংগীতের সৌন্দর্য এখানেই—শিল্পী চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি মানুষের সঙ্গে থেকে যায়। কোনো এক বিকেলে পুরোনো গান শুনতে গিয়ে, কোনো নিঃসঙ্গ রাতে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ বাজতে থাকা গিটারের সুরে আবার ফিরে আসেন আইয়ুব বাচ্চু।
তাঁকে মনে করার জন্য সব সময় কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। তাঁর গানই বারবার ফিরিয়ে আনে তাঁকে। নতুন প্রজন্মের কেউ যখন প্রথমবার ‘সেই তুমি’ শোনে, কিংবা গিটারের তারে তাঁর কোনো সুর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখনই প্রমাণ হয়—একজন শিল্পীর জীবন থেমে গেলেও তাঁর প্রভাব থেমে থাকে না।
আইয়ুব বাচ্চু নেই, কিন্তু তাঁর গিটার এখনো কথা বলে। তাঁর গান এখনো ভালোবাসার গল্প শোনায়, বিচ্ছেদের ব্যথা ছুঁয়ে যায়, নিঃসঙ্গতার পাশে বসে থাকে। আট বছর পরও তাই তাঁকে হারানোর শোকের পাশাপাশি রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা।
তিনি বেঁচে আছেন তাঁর গানে, তাঁর সুরে, আর সেই অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে—যাঁদের জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে আইয়ুব বাচ্চুর একটি গান হয়ে উঠেছিল একান্ত আপন।





