দেশে তরুণ-তরুণীদের উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৪৬ অপরাহ্ন, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪৬ অপরাহ্ন, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে তরুণ বয়সীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং একই সময়ে মারা গেছেন ২১৯ জন। নতুন শনাক্তদের বড় একটি অংশই অবিবাহিত তরুণ–তরুণী, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে (২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) নতুন শনাক্ত এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে ৪২ শতাংশই অবিবাহিত তরুণ–তরুণী। আগের বছর এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সংক্রমণের এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি তরুণ সমাজে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: সানওয়ে–জেজি হেলথকেয়ারের চুক্তি, বাংলাদেশিদের বিদেশে চিকিৎসা হবে আরও সহজ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যশোরে চলতি বছরে ৫০ জনের বেশি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা জানান, আক্রান্তদের মধ্যে স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাই তুলনামূলকভাবে বেশি। তার মতে, এই বয়সে সচেতনতা কম থাকলেও কৌতূহল বেশি থাকে, যা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইনজেক্টেবল ড্রাগ ব্যবহারের সময় একই সুচ ভাগাভাগি করা, কনডম ছাড়া যৌন সম্পর্ক, একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সঙ্গীর স্বাস্থ্য অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়াকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

আরও পড়ুন: সারাদেশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস, আক্রান্ত হলেই মৃত্যু ঝুঁকি

জাতিসংঘের এইডস কর্মসূচি ইউএনএইডসের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, অবিবাহিত আক্রান্তদের বড় অংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। “এই বয়সে অনেকের মধ্যেই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। সচেতনতার অভাবে না বুঝেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ে,” বলেন তিনি।

একটি এনজিওতে এইচআইভি আক্রান্তদের কাউন্সেলিংয়ে যুক্ত প্রতিনিধি রাসেল আহমেদ (ছদ্মনাম) বলেন, অল্প বয়সীদের অনেকেই ঝুঁকির মাত্রা বোঝে না। সামাজিক ট্যাবুর কারণে কনডম ও সুরক্ষার বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যায়। এসব ট্যাবু ভাঙা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, এইচআইভি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়মিত ওষুধ সেবনে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেক কমে যায়। দেশের বিশিষ্ট ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এইচআইভি আক্রান্ত নারী ও পুরুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। তবে সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে অনেক তরুণ দেরিতে পরীক্ষা করান বা চিকিৎসা শুরু করেন।

মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা তরুণদের আচরণে প্রভাব ফেলছে। তার মতে, যৌনতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও সচেতনতার অভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ কমাতে স্কুল পর্যায়ে প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করা, ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।