মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এক চরম যুদ্ধাবস্থায় রূপ নিচ্ছে। ইরানকে চারদিক থেকে সামরিকভাবে অবরুদ্ধ বা ঘিরে ফেলার এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন। তেহরানের উপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে আমেরিকা এই অঞ্চলে তার সামরিক শক্তি ও সমরসম্ভার নজিরবিহীনভাবে বাড়িয়ে চলেছে। তবে এই সাঁড়াশি চাপের মুখেও ইরান পিছু হটার পাত্র নয়, বরং তারা প্রতিনিয়ত পাল্টা প্রতিরোধ এবং চরম আঘাতের হুঁশিয়ারি বা ‘হুংকার’ দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যকার সংঘাত আবারও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরব ও কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা রক্ষায় অতিরিক্ত দুটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে মার্কিন দুই কর্মকর্তা ও একটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। শুক্রবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি গত মাসে সৌদি আরবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনার সুরক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যটি কাতারে একটি প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনার নিরাপত্তায় পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: মক্কার পর এবার মদিনার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা হুথিদের
যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করলে সৌদি আরব ও কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় ওয়াশিংটন পাশে থাকবে, এ বিষয়ে দুই দেশকে আশ্বস্ত করা। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তিক্ততা ভুলে পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে? গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী মনসুর বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন- যা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে ইঙ্গিতবহ। এরই মধ্যে ট্রাম্প আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ইরানকে হয় একটি চুক্তিতে আসতে হবে, নতুবা পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টের শুরুতে সৌদি ও কাতারের নেতারা ট্রাম্পকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে পাল্টা আঘাত হিসেবে সৌদি ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ওই উদ্বেগ ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল এবং সামরিক হামলার পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
আরও পড়ুন: ইরান ঘিরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের নতুন সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। তবে নিজেদের তেল স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা না পেলে রিয়াদ এ ধরনের অনুমতি দিতে অনিচ্ছুক হতে পারে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ধারাবাহিকতায় নতুন এ প্যাট্রিয়ট মোতায়েনের খবর এলো। এর আগে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত নৌ ও সামরিক শক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরী
ও দুটি উভচর সেনাদল মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এরই মধ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং ইউএসএস মেকিন আইল্যান্ডের নেতৃত্বে একটি উভচর প্রস্তুতি দল মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওনা হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন বহরে ৭ হাজারের বেশি নাবিক ও প্রায় ২ হাজার মেরিন রয়েছে। ইউএস নেভির এক মার্কিন কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ায় বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করা হচ্ছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও দুটি ল্যান্ডিং গ্রুপ মোতায়েন করা হবে। তার ভাষ্য, পশ্চিম এশিয়ায় বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করা হলে ইরানকে মোকাবিলায় মার্কিন নেতাদের সামনে বিভিন্ন বিকল্প পথ খোলা থাকবে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট সান ডিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। একই ঘাঁটি থেকে ইউএসএস মেকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপও রওনা হয়েছে। এই বহরে দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন রয়েছে। নতুন বহর পৌঁছালে ওই অঞ্চলে একসঙ্গে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে। এর ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিনে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি সেখানে কয়েক’শ মার্কিন সামরিক বিমানও রয়েছে। এ ধরনের বড় মার্কিন নৌ উপস্থিতি এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও দেখা গিয়েছিল। তখন মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে তিনটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ছিল, যা ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো ঘটেছিল। নতুন মোতায়েন সেই মাত্রার সামরিক উপস্থিতি আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে প্রায় ৯ হাজার সেনা ও নাবিককে ওই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত নতুন হামলার নির্দিষ্ট তারিখ বা লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়নি। ওয়াশিংটন যেখানে তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইরানের প্রভাব খর্ব করতে এই হামলাকে তাদের আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে দাবি করছে, সেখানে তেহরান এটিকে একতরফা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে প্রচার করছে। এর ফলে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লেবাননে সক্রিয় থাকা ইরান-পন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো নতুন করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও রকেট হামলা জোরদার করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা হ্রাস করতে এবং সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি না হওয়ায়, বিশ্ব রাজনীতি এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ফের আক্রমণ করলে তার আগের চেয়ে অনেক বড় ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় পরিসরে সামরিক হামলা শুরু করলে আরও ব্যাপক ও কঠোর পাল্টাজবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় মনে করছেন, এ উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এখন এ ধারণা জোরালো হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে কঠোর জবাব দিতে হবে। তবে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তেহরান। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি এবং ইরানের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার বাইরেও যেসব দেশ মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে, সেসব দেশে হামলার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত আকারের আক্রমণ চালাবেন, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছে তেহরান।
আজিজি বলেন, ‘তবে তাদের (ইরানের) মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা প্রতীকী কোনো পদক্ষেপের জবাবে প্রতীকী প্রতিক্রিয়া জানাতে চায় না; বরং প্রতিপক্ষকে নিরস্ত রাখতে নিজেদের সক্ষমতা আবার প্রতিষ্ঠার আশায় সংঘাত আরও বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ট্রাম্পের জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক ঝু ঁকি তৈরি করতে পারে, তা-ও বিবেচনা করছে তেহরান। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে এ যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়।
এদিকে মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্যও দেশটিতে উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। ইরানের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় পরিসরে হামলা চালালে ইরানকে সহায়তা করার জন্য লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে তেহরান। ওই কর্মকর্তারা জানান, নির্দেশনায় হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত বিস্তৃত সমন্বিত পাল্টাজবাবের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আবদুর রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ইয়েমেনের সহযোগী ছিল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দুই শক্তিধর দেশ ইয়েমেনে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে। সৌদিরা ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় আর আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি)’ সহায়তা করে। আরও বেশি কিছু বিষয়ে বিশেষ করে সুদান ও ইরান ইস্যু এবং অর্থনৈতিক ইস্যুতে তাদের মতপার্থক্য ছিল।
গত বুধবার সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে ভাষণ দেওয়ার সময় যুবরাজ সালমান বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর চালানো হামলা এটাই প্রমাণ করে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অবিচ্ছেদ্য। আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে মিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অখণ্ডতা এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি, যাতে জিসিসির লক্ষ্য অর্জন ও নাগরিকদের আকাক্সক্ষা পূরণ সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে আধুনিকায়ন, সিরিয়া ও কাতার কিংবা তুরস্ক—এমন নানা বিষয়েই উভয় দেশের নীতিতে মিল দেখা গেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ইসলামপন্থি মনোভাব নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত গভীর সংশয় পোষণ করলেও সৌদি আরব ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে তাকে নিজেদের বলয়ে আনার চেষ্টা করেছিল।
মূলত, মোহাম্মদ বিন সালমানের পরামর্শদাতা বা মেন্টর হিসেবে বিবেচনা করা হতো মোহাম্মদ বিন জায়েদকে। এমনকি এক সময় তারা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ (ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি) যোগ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করেছিলেন। এর আগেও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জুলাই মাসে সৌদি আরবের ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ এক্স বার্তায় লিখেছিলেন, আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্পর্ক হলো অভিন্ন ইতিহাস এবং দুই ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের মধ্যকার গভীর ও অটুট বন্ধনেরই সম্প্রসারিত রূপ, যারা একই ভাগ্যের সুতোয় বাঁধা। এরপর আগস্টে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ সৌদি আরবের বাদশাহ সালমানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাকে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এই প্রেক্ষাপটে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়াটা অত্যন্ত যৌক্তিক। অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জিসিসির সম্মিলিত চাপ সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের একক দাবির চেয়ে অধিক কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব যদি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিয়েও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বা নজরদারির ক্ষেত্রে ইসরাইলের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করে, তখন সৌদির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তাই এটা বলাই যায়, সম্ভবত এই অঞ্চলে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের বা সমঝোতার আরেকটি প্রক্রিয়ার সূচনা হতে যাচ্ছে।





