দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও গাজা ছাড়তে নারাজ বয়স্ক ফিলিস্তিনিরা
গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা অনেক ফিলিস্তিনির জন্য স্বস্তি তৈরি হলেও গাজার বহু বয়স্ক মানুষ এখনও অঞ্চলটি ছাড়তে রাজি নন। তাদের কাছে গাজায় থাকা টিকে থাকা, প্রতিরোধ এবং ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
৭৩ বছর বয়সী কেফায়া আল-আসার বলেন, ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় তার বাবা-মা নিজ গ্রাম জুলিস ছেড়ে যাওয়াকে তিনি ঐতিহাসিক ভুল মনে করেন। বর্তমানে সেই এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত। তিনি জানান, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই তিনি গাজা ছাড়তে চান না।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে জুমার নামাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ৩২
উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকার বাসিন্দা কেফায়া ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে পাঁচবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি মধ্য গাজার নুসেইরাতের একটি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন। ২০২৩ সালের শুরুতে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানহীন কেফায়া বলেন, বাস্তুচ্যুতি তাকে তার বাবা-মায়ের ট্রমার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তার বাবা-মা যেমন সবকিছু হারিয়েছিলেন, তিনিও এখন সব হারিয়েছেন। শৈশবে শরণার্থী শিবিরে তাবুতে বসবাসের স্মৃতি আবার ফিরে এসেছে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে সৌদি আরব, কিনতে পারছেন যাঁরা
কেফায়া বলেন, তিনি নিজের মাতৃভূমিতেই মৃত্যুবরণ করতে চান। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি গাজা ছাড়বেন না বলে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন। উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও যুদ্ধের কারণে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
এদিকে সোমবার থেকে আংশিকভাবে চালু হয়েছে রাফাহ সীমান্ত। এটি গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হলেও ইসরায়েল নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত কেবল গুরুতর অসুস্থ কিছু ফিলিস্তিনি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সীমিতভাবে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
গাজার আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তালাল আবু রুকবা বলেন, ইসরায়েল গাজায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যা বসবাসের অযোগ্য। তার মতে, ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূমিতে থেকে গেলে ইসরায়েলের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হেল্পএজ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণায় দেখা গেছে, গাজায় সহায়তা ও ওষুধ সরবরাহে বাধার কারণে বয়স্কদের মধ্যে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সাক্ষাৎকার দেওয়া বয়স্কদের ৭৬ শতাংশ তাবুতে বসবাস করছেন এবং ৮৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের বসবাসের পরিবেশ স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া ৬৮ শতাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ বন্ধ বা কমাতে বাধ্য হয়েছেন এবং প্রায় অর্ধেক মানুষ অন্যদের খাবার দেওয়ার জন্য নিজের খাবার বাদ দিয়েছেন।
অন্যদিকে মানসিক সমস্যাও বাড়ছে। প্রায় ৭৭ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তি জানিয়েছেন, দুঃখ, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও অনিদ্রা তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে।
৮৫ বছর বয়সী নাজমিয়া রাদওয়ানও একই সংকটে রয়েছেন। অসুস্থতা, অপুষ্টি এবং ওষুধের অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি গাজা ছাড়তে রাজি নন। ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় তিনি জেরুজালেম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় আশ্রয় নেন।
নাজমিয়া বলেন, নাকবার পর থেকে তার জীবন কেটেছে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে। তিনি জানান, অসুস্থ ও একাকী হলেও কখনো গাজা ছাড়বেন না। ভিক্ষুক কিংবা গৃহহীন হয়ে জীবন কাটাতে হলেও নিজ ভূমিতেই থাকতে চান তিনি।





