‘জুলাই ইনডেমনিটি’তে সংসদীয় ঐকমত্য, তবে হত্যার দায়মুক্তি নিয়ে আইনি ঝুঁকি প্রকট
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় নেমে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’ সংসদে অনুমোদনের সুপারিশ করতে একমত হয়েছে। তবে হত্যাসহ ফৌজদারি অপরাধে দায়মুক্তির বৈধতা নিয়ে সংবিধান, জননীতির নীতি এবং ফৌজদারি আইনের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হওয়ায় বিষয়টি ঘিরে তীব্র আইনি বিতর্ক দানা বাঁধছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’—যা মূলত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার বিধান রাখে—তা সংসদে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করতে কমিটি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঈদের পর প্রথম কার্যদিবসেই টানা ১১ ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রীর অফিস
তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই আইনি অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—ফৌজদারি অপরাধ, বিশেষ করে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস বা লুটপাটের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আদৌ সংবিধানসম্মত কি না।
‘ইনডেমনিটি’ বনাম ফৌজদারি আইন:
আরও পড়ুন: পর্যাপ্ত তেল আছে, পাম্পে লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই: জ্বালানিমন্ত্রী
আইনজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি প্রদান জননীতির পরিপন্থী এবং আইনগতভাবে টেকসই নয়। প্রচলিত আইনি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের পর দায় এড়াতে চুক্তি বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করতে পারে না। এ ধরনের বিধান আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে তা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না এই বিষয়ে বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে কোনো ইনডেমনিটি টেকে না। বর্তমান সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, তবে আইনের বিচারে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
কমিটির অগ্রগতি ও অবস্থান:
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন বৈঠক শেষে জানান, প্রথম দিনে অর্ধেকেরও কম অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং বেশ কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্নমত রয়েছে। সেগুলো পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয় এবং একাধিক বৈঠকের প্রয়োজন হবে। তবে ‘জুলাই ইনডেমনিটি’ বিষয়ে কমিটির মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “আমরা এখনো আলোচনার মধ্যে আছি। সংবিধান ও জন–আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় করেই এগোতে চাই। সংবিধান অবশ্যই সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকবে।”
সংবিধান বনাম ‘জুলাই আকাঙ্ক্ষা’
সংবিধান ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনার মধ্যে সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধী দলের সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। প্রয়োজনে জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রাখতে সংবিধানেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে।”
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী সংবিধানকেই সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করায় দুই ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যা ভবিষ্যতে সংসদীয় বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞ মত: সমর্থন ও শঙ্কা
সংসদ বিষয়ক গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, আন্দোলনকারীদের ভবিষ্যতে সুরক্ষা দিতে এই আইনের প্রয়োজন।
এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটির এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত । তার মতে, “গণঅভ্যুত্থান ছাড়া স্বৈরাচারী শাসনের পতন সম্ভব হতো না। তাই আন্দোলনকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ যৌক্তিক।
অন্যান্য অধ্যাদেশেও বিস্তৃত আলোচনা:
প্রথম দিনের বৈঠকে দুর্নীতি দমন কমিশন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, গুম প্রতিরোধ, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা, পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণে কমিটি নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। পাশাপাশি ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ’ অপরিবর্তিত রাখার পক্ষেও মত দেওয়া হয়েছে।
সামনে কী?
কমিটি আগামী কাল বুধবার পুনরায় বৈঠকে বসবে এবং সব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বৈঠক চলবে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—ফৌজদারি অপরাধে দায়মুক্তির বিধান কি শেষ পর্যন্ত সংবিধান ও আদালতের পরীক্ষায় টিকে থাকবে, নাকি এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ‘জুলাই ইনডেমনিটি’র ভবিষ্যৎ—এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।





