হজের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তপ্ত মরুর বুকে অনন্ত প্রশান্তির স্রোতধারা বইছে। ক্ষমার প্রত্যাশায় লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন তাওহিদের ছায়াতলে। ভাষা-বর্ণের ব্যবধান ভেঙে মিলিত হয়েছেন এক আত্মিক ঐক্যে। মিনা, আরাফাসহ সব খানেই আল্লাহর করুণার বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। সফেদ বসনে আচ্ছাদিত প্রতিটি প্রাণ সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাকওয়ার মহান শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে স্রষ্টার প্রতি অগাধ প্রেম ও চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের যে দৃশ্য এখানে রচিত হয়, তা মানবজাতিকে শাশ্বত শান্তির পথ দেখায়। এই পবিত্র আবহেই আজ আরাফার ঐতিহাসিক ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে হজের খুতবা।
পুণ্যময় এই সফরের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠান নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার ঐশী সুযোগ। ইমানি চেতনায় ভাস্বর এমন এক পবিত্র ক্ষণের প্রতীক্ষায় প্রহর গোনেন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের ধর্মপ্রাণ মানুষ, যার চূড়ান্ত প্রাপ্তি হলো মহান রবের অসীম ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। জীবনের সব ভুলত্রুটি মুছে ফেলে এক নিষ্কলুষ অধ্যায় শুরুর প্রেরণায় উদ্বেলিত প্রতিটি মুমিনের কণ্ঠস্বর এখানে একাকার হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: চুক্তির কথা চললেও ইরানে আমেরিকার নতুন হামলা, কী করবে ইরান?
হজ মানে নিজেকে সমর্পণ করা। হজ মানে জীবনের সব অহংকার, আড়ম্বর, বিভেদ ও বৈষম্য দূরে রেখে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। কাফনের মতো সাদা ইহরামে আবৃত হাজারও প্রাণের সমবেত উচ্চারণ ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ তাদের দুনিয়াবি পরিচয় ভেঙে দেয়। এই ধ্বনি যেন আসমান কাঁপিয়ে তোলে, ফেরেশতারা অবাক বিস্ময়ে নেমে আসে, আর মহান প্রভু বলেন, আমার বান্দারা এসেছে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে।
প্রতি বছর হজ মৌসুমে আরাফার ময়দান হয় ইতিহাসের এক মহান সাক্ষী, সেখানে বান্দারা কাঁদে, আল্লাহ শোনেন। বান্দারা ডাকে, আল্লাহ জবাব দেন। এই পবিত্র দিনে মানবজাতি যেন নতুন করে প্রতিজ্ঞা করে, তারা আল্লাহর পথে চলবে, শান্তি, সংহতি ও ন্যায়ের দিশারী হবে।
আরও পড়ুন: প্রিয়তম স্ত্রীকে নিয়ে তাজমহলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
গত ২৫ মে (সৌদিতে ৮ জিলহজ) মিনা প্রান্তরে অবস্থানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা। হজ পালনকারীদের ৮ জিলহজ জোহরের নামাজের আগে মিনায় পৌঁছানো সুন্নত। মিনায় হাজিরা জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। এখানে সারাদিন ও রাত যাপন শেষে আজ (২৬ মে) রওনা হয়েছেন আরাফার ময়দানের উদ্দেশে। অনেকেই পৌঁছে গেছেন। এরই মধ্যে আরাফার ময়দান মুখরিত হয়ে উঠেছে ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে।
প্রতি বছর জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করা হয়। এ সময়ের মধ্যে হজযাত্রীরা পাঁচ দিনের বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।
পবিত্র হজের অন্যতম ফরজ আমল হলো ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। এবার দিনটি তীব্র গরমের সময় হওয়ায় সৌদি কর্র্তৃপক্ষ আরাফার ময়দানে হাজিদের নির্দিষ্ট তাঁবুতে অবস্থানের আহ্বান জানিয়েছে।
সৌদি আরবের ধর্মবিষয়ক প্রেসিডেন্সি ঘোষণা করেছে, এ বছর হজের খুতবা প্রদান করবেন মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এক রাজকীয় ফরমানে তাকে আরাফার দিনে খুতবা দেওয়ার জন্য নিয়োগ দিয়েছেন। আজ আরাফার ময়দানে স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া ১২টায় হজের খুতবা দেবেন তিনি।
হজযাত্রীরা আরাফার ময়দানে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত তালবিয়া, তাহমিদ, দোয়া-দরুদ, ইসতেগফার, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে থাকবেন। সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফায় রওনা হবেন। রাত যতক্ষণই হোক মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন। হাজিরা এ রাতে মুজদালিফায় বিশ্রাম নেবেন বা ঘুমাবেন। ফজরের নামাজ পড়ে ফের মিনার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। মুজদালিফা থেকে পাথর সংগ্রহ করে সঙ্গে আনবেন।
১০ জিলহজ হাজিরা শুধু বড় শয়তানের স্তম্ভে (জামারাতে উকবা) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করবেন। জামারাতে পাথর মারার পর কোরবানির সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোরবানি দেবেন। কোরবানির পর মাথা মুণ্ডাবেন বা চুল খাটো করবেন। এসব আমল শেষে তাওয়াফ ও তাওয়াফে জিয়ারত করবেন। অবশ্য ভিড় এড়ানোর জন্য এ তাওয়াফ ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে।
১১ জিলহজ শয়তানের তিন স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করবেন। ১২ জিলহজ তিন স্তম্ভে আবার পাথর নিক্ষেপ করবেন। এভাবে পাথর মারার সংখ্যা ১০ জিলহজ সাতটি, ১১ জিলহজ সাতটি করে ২১টি এবং ১২ জিলহজ সাতটি করে ২১টি পাথর মারতে হবে।
উল্লেখ্য, ১০ ও ১১ জিলহজ তাওয়াফে জিয়ারত করতে না পারলেও ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে। ১২ তারিখের পর হাজিরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। এই হলো হজের সার্বিক কার্যক্রম।
সম্প্রতি সৌদির হজ ও ওমরাহমন্ত্রী তওফিক আল-রাবিয়াহ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে জানান, এবার হজ মৌসুমে হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালে ৩০ লাখের বেশি মানুষ হজ পালন করেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যার অন্যতম। তবে করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা সীমিত করে মাত্র ১০ হাজারে নামিয়ে আনা হয়।
২০২১ সালে শুধু সৌদি নাগরিক ও দেশটিতে অবস্থানরত বাসিন্দাদের মধ্য থেকে ৫৮ হাজার ৭৪৫ জনকে হজের অনুমতি দেওয়া হয়। পরের বছর বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ হজ পালন করেন।
২০২৩ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা আবারও মহামারিপূর্ব অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ওই বছর ১৮ লাখের বেশি মুসল্লি হজ আদায় করেন। ২০২৪ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৪ জন। আর ২০২৫ সালে তা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ২৩০ জনে।
সৌদি আরবের মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার অধীনে ধর্মবিষয়ক বিভাগ এবারের হজের খুতবা ৩৫টি ভাষায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। আরব নিউজের বরাতে জানা যায়, মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববির পরিচালনা পরিষদের প্রধান শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইস বলেছেন, ‘ইসলামের মধ্যপন্থার বার্তা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ৩৫টি ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
হজের খুতবা আরাফার ময়দানে অবস্থিত নামিরা মসজিদ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। হজের আধ্যাত্মিক শিক্ষা বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় খুতবার অনুবাদ সম্প্রচার করা হয়।
হজের খুতবা যেসব ভাষায় অনুবাদ করা হবে তার কয়েকটি হলো বাংলা, ফ্রেঞ্চ, মালয়, উর্দু, ফারসি, চাইনিজ, তুর্কি, রাশিয়ান, হাউসা, ইংরেজি, সুইডিশ, স্প্যানিশ, সোয়াহিলি, আমহারিক, ইটালিয়ান, পর্তুগিজ, বসনিয়ান, মালায়লাম, ফিলিপিনো, জার্মান ইত্যাদি।





