দেশে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে গবেষণার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি: প্রতিমন্ত্রী টুকু
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, “দেশে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে গবেষণার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।” শনিবার ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর সেফ ফুড (বিএসএসএফ) আয়োজিত ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড হেলথ’ শীর্ষক ৮ম জাতীয় বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এদিকে, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বাজারের মাছ, মাংস, দুধ, ফল, শাকসবজি থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, ফরমালিন, কৃত্রিম রং ও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মকভাবে পড়ছে।
আরও পড়ুন: শিল্পকারখানা চালু থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, স্থানীয় অর্থনীতি সচল থাকে : বাণিজ্যমন্ত্রী
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান ও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মানুষ:
আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে খাদ্যে ভেজালের কারণে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা ও বন্ধ্যাত্বের মতো রোগ বাড়ছে। বাজারে বিক্রি হওয়া অনেক ফলে পাকানোর জন্য কার্বাইড, মাছ ও মাংসে ফরমালিন, সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক এবং দুধে ডিটারজেন্ট বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ বহুদিনের।
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। দূষিত ও ভেজাল খাদ্যের কারণে শিশুদের অপুষ্টি, পেটের রোগ, শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, বুদ্ধিবিকাশে বাধা এবং বিভিন্ন জটিল রোগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সাধারণ চিকিৎসাকেও অকার্যকর করে তুলতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বাড়ছে নতুন সংকট:
পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশু খামারে দ্রুত উৎপাদনের জন্য অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টি এখন বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, খাদ্যের মাধ্যমে এসব অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে “অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স” তৈরি করছে। ফলে সাধারণ সংক্রমণেও কার্যকর ওষুধ কাজ না করার ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রতিমন্ত্রী টুকু বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে গবেষণা ও পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জীববৈচিত্র্য ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব:
সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একসময় “মাছে-ভাতে বাঙালি” হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও অপরিকল্পিত উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
মাদক ও খাদ্য নিরাপত্তা—দুই সংকটেই তরুণ সমাজ ঝুঁকিতে
বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী দেশের মাদক সমস্যাকেও বড় সামাজিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাদক ও অনিরাপদ খাদ্য—দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনে জনস্বাস্থ্য ব্যয় আরও বাড়বে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হবে। তাই এখনই কার্যকর গবেষণা, কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।





