৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

পিরোজপুরে এলজিইডির ৬ হাজার কোটি টাকা তুলে পালিয়েছে মহারাজ অনুসারীরা

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:১৯ পূর্বাহ্ন, ২৪ মে ২০২৬ | আপডেট: ৯:১৯ পূর্বাহ্ন, ২৪ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় অনুমোদিত হাজারো প্রকল্পে কাজ না করেই প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

শনিবার (২৩ মে) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ অভিযোগ করেন।

আরও পড়ুন: আজ সরকারি চাকরিজীবীদের শেষ কর্মদিবস, কাল থেকে টানা ৭ দিনের ছুটি

প্রতিমন্ত্রী জানান, পিরোজপুরে অনুমোদিত ২ হাজার ৪৬০টি প্রকল্পের মধ্যে ১ হাজার ৬১০টির বাস্তব কোনো কাজ না হলেও টেন্ডারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য, এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা কমিশনের এক সাবেক সচিবসহ একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুন: শিশু রামিসা হত্যার চার্জশিট আজ, বিশেষ প্রসিকিউটর নিয়োগ

মীর শাহে আলম বলেন, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ইতোমধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় বছর ধরে পিরোজপুর জেলার প্রায় সব উন্নয়নকাজ বন্ধ রয়েছে। এতে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও হাটবাজার নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।

অনেক সড়ক অসমাপ্ত অবস্থায় থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১২ মে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কমিটিকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

মীর শাহে আলম বলেন, যেখানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুদকে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।

মৌখিক নির্দেশে বন্ধ ছিল উন্নয়নকাজ

পিরোজপুরে উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা ছিল না। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় ‘মৌখিকভাবে’ কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘একটি জেলার সব উন্নয়নকাজ ১৮ মাস বন্ধ থাকা ভয়াবহ বিষয়। সড়ক, গণপূর্ত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রকৌশল, জনস্বাস্থ্য– সব বিভাগের উন্নয়নকাজ বন্ধ ছিল। এতে পিরোজপুর কার্যত বিচ্ছিন্ন জেলায় পরিণত হয়েছিল।

মীর শাহে আলম জানান, পিরোজপুরের তিন সংসদ সদস্য ও এক প্রতিমন্ত্রীর আবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি ইতোমধ্যে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে। দুদকের তদন্তাধীন প্রকল্প বাদ দিয়ে অন্যান্য অসমাপ্ত প্রকল্পে সীমিত পরিসরে কাজ শুরুর সুপারিশ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঈদের পর আমরা পিরোজপুরে যাব। সরেজমিনে পরিদর্শন করে সীমিত আকারে উন্নয়নকাজ শুরু করা হবে।’

টেন্ডার হয়েছে, কাজ হয়নি

দুর্নীতির ধরন সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, টেন্ডার ও কার্যাদেশ দেওয়া হলেও পরে আর কোনো কাজ হয়নি। শুধু বিল তৈরি করে ট্রেজারি থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

মীর শাহে আলম বলেন, ‘ঠিকাদাররা টাকা তুলে বিদেশে চলে গেছেন। অনেকে দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। ৫ আগস্টের পর তারা দেশ ছেড়েছেন বলে তথ্য পেয়েছি।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও তিন বছরের প্রকল্পে প্রথম বছরেই পুরো বরাদ্দ তুলে নেওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে।

ব্রিজ আছে, সংযোগ সড়ক নেই

প্রকল্প পরিকল্পনায়ও বড় ধরনের অসংগতির অভিযোগ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণ হলেও সেখানে সংযোগ সড়ক নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনীর ছাগলনাইয়ার একটি সেতুর কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ হলেও সেখানে এখনো মানুষ মই দিয়ে ওঠানামা করছে।

মীর শাহে আলম বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ জুনে শেষ হবে, কিন্তু সংযোগ সড়কের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। এটা পরিকল্পনার বড় ধরনের ত্রুটি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন এক বছরের মধ্যে

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। তবে কোন নির্বাচন আগে হবে, তা বাজেট ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

তিনি বলেন, জেলা পরিষদ নির্বাচন সবার শেষে হবে, কারণ সেখানে ভোটার হিসেবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজন হয়।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মীর শাহে আলম বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

ইজিবাইক নিবন্ধনে নতুন আইন

ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন বিষয়ে সরকার নতুন আইন করতে যাচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বুয়েট অনুমোদিত নকশার যানবাহনগুলো সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। এতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্বও পাবে।