বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়াসহ চরম নিরাপত্তাহীনতায় এলাকাবাসী, রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক তার-মিটার চুরির হিড়িক
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাতের আঁধারে অভিনব কায়দায় বৈদ্যুতিক তার ও মিটার চুরির হিড়িক বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়াসহ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। তবে তার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক চোরের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। অসাধু চক্রের সহায়তায় এই বিদ্যুৎ ও তার চুরির ঘটনা ঘটছে, যা আবাসিক এলাকার পাশাপাশি বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একইদিন পুরান ঢাকার ওয়ারীর মতো ব্যস্ত ও আবাসিক এলাকায় রহস্যজনকভাবে মূল লাইনের বৈদ্যুতিক তার (সার্ভিস ড্রপ) চুরির ঘটনা ঘটে। রাতের আঁধারে সংঘটিত এই চুরির ফলে আকস্মিক বিদ্যুৎহীনতা ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় এলাকাবাসী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন।
নগরবাসী বলছেন, বৈদ্যুতিক তার ও মিটার চুরি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, চোরেরা মিটার খুলে চিরকুটে মোবাইল নম্বর রেখে যায় এবং বিকাশে টাকা দাবি করে। নগরবাসী এই চক্রের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও স্থানীয়ভাবে সতর্কতা অবলম্বনের দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ৭ জেলায় বন্যা: প্রাণহানি বেড়ে ৫৪, ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লাখের বেশি মানুষ
সর্বশেষ দৈনিক জনতার বার্তা সম্পাদক হাবিবুর রহমানের উত্তরখানের মাজার পাড়া বাসায় রোববার দিবাগত রাতে ৩০ গজের বেশি বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায় একদল সংঘবদ্ধ চোর। এতে প্রায় ৬ ঘণ্টার বেশি সময় অন্ধকারে থাকতে হয়েছে তার পরিবারের সদস্যদের। পরে সকালবেলা প্রায় ১০ হাজার ১০০ টাকা দিয়ে বৈদ্যুতিক তার কিনতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অবশেষে দেশে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা বাড়তে শুরু করেছে।
গত ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন বাড্ডা বৈশাখী সড়কের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচ থেকে মো. জহিরুল ইসলাম (২২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ভোরের দিকে বৈদ্যুতিক তার কাটতে (চুরি) গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২৯ মার্চ রাজধানীর কলাবাগান থানার ভূতের গলি এলাকার একটি বাসায় বৈদ্যুতিক তার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বয়স আনুমানিক ৩০ বছর।
আরও পড়ুন: বরিশালে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ-২০২৬ পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী
সম্প্রতি ডেমরা থানাধীন ৬৬ নং ওয়ার্ড ডগাইর পূর্বপাড়া চৌধুরী মার্কেটের বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে রাত সাড়ে তিনটার দিকে ট্রান্সমিটার চুরি হয়ে যায়। এতে এলাকায় বসবাসরত বাসিন্দারা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ভোগান্তিতে পড়েন। পরে ডেমরা থানার বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারীরা এসে সমস্যার নিরসন করেন। তবে জনসচেতনতা বাড়াতে রাজধানীর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের নিজ নিজ মিটারে লোহার খাঁচা বানিয়ে সেটির ভেতর মিটার রাখতে এবং বাসার সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৈয়দপুরে ২ মাসে ১৫ কিমি বৈদ্যুতিক তার চুরি: নীলফামারীর সৈয়দপুরে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা। সংঘবদ্ধ চোর চক্রের ধারাবাহিক তৎপরতায় একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সর্বশেষ ১২ জুলাই গভীর রাতে শহরের মিস্ত্রিপাড়া মসজিদের পাশের একটি বাড়ি থেকে প্রায় ছয় হাজার টাকা মূল্যের সার্ভিস তার কেটে নিয়ে গেছে চোরেরা। বাড়ির মালিক জানান, রাতে বৃষ্টির সুযোগে এই চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর আগে মুন্সিপাড়া এলাকায় মহিলা কলেজ সংলগ্ন জাভেদ-নাজনীন দম্পতির বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগের তার এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইবার চুরি হয়। বারবার তার চুরির ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা।
একইভাবে চুরির প্রভাব পড়েছে জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও। শহীদ ক্যাপ্টেন মিধা শামসুল হুদা সড়কের (বিমানবন্দর সড়ক) স্ট্রিট লাইটের তার চুরি হওয়ায় রাত নামলেই ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। সেনানিবাস ও বিমানবন্দরে যাতায়াতের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি অন্ধকার থাকায় পথচারী ও যানবাহনচালকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় শিক্ষক এহসানুল কবির বলেন, বারবার তার চুরির কারণে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সৈয়দপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা বলেন, তার চুরির বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে পুলিশের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। পৌরসভা থেকে চুরি হওয়া স্থানে দ্রুত লাইট ও তার মেরামতের কাজ চলছে। তবে সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম জানান, চুরি প্রতিরোধে পুলিশের নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে একজন চোরকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় বিদ্যুতের তার চুরি করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক শক খেয়ে এক অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের বয়স আনুমানিক ২৫-৩০ বছর। তিনি নীল রঙের টি-শার্ট ও জিন্স প্যান্ট পরা অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই যুবক বিদ্যুতের তার চুরির উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। চুরির চেষ্টাকালে তিনি উচ্চ ভোল্টেজের তারে জড়িয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বৈদ্যুতিক শক খেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি জানান, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে তার চুরি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক কাজ, যা প্রায়ই প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।





