গণপূর্তের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুরের অবৈধ সম্পদের পাহাড়

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:১৭ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৫ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সামান্য অফিস ক্লার্ক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং সরকারি পদ ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। চল্লিশ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে নামে-বেনামে তিনি গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, মিজানুর রহমান ২০০০ সালে অফিস সহকারী পদে কর্মজীবন শুরু করেন। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ পন্থায় কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ইতিমধ্যে এ নিয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে)। দীর্ঘ ২৬ বছর মিজানুর রহমান যেই উপজেলায় কাজ করেছেন, সেই মীরসরাই উপজেলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করার শর্তে জানিয়েছেন, গেল ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ছায়াতলে ছিলেন মিজানুর রহমান। আওয়ামী লীগের কর্মীদের দোহাই দিয়ে তাদের ওপর ভর করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অর্থ কামিয়েছেন। তার টেবিলে যেই ফাইলই গিয়েছে, তা ছাড়াতে গুনতে হয়েছে তার দেওয়া নির্দিষ্ট হারে চাঁদা। এক কথায়, চাঁদা ছাড়া ফাইল ছাড়তেনই না মিজানুর রহমান।

আরও পড়ুন: মেয়েদের সর্বজনীন উপবৃত্তি পুনরায় চালুর উদ্যোগ, দুই জেলায় মিড-ডে মিলের পাইলট

একই কথা জানিয়েছেন আবুল কালাম নামে এক ভুক্তভোগী। তিনি জানান, উপ-প্রকৌশলী মিজানুর রহমান টাকা ছাড়া কোনো কিছুই বুঝেন না। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম ভাঙিয়ে তিনি তার আখের গুছিয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক বনে গেছেন। একজন সামান্য সরকারি কর্মচারী হয়ে তিনি কীভাবে এত টাকার মালিক বনে গেছেন, তার সঠিক খোঁজখবর নিলে বেরিয়ে আসবে মিজানুর রহমানের দুর্নীতির চিত্র।

মীরসরাইয়ে কর্মরত অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে একবার চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন মিজানুর রহমান। পরে রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। সুচতুর মিজান যখন যাকে প্রয়োজন, স্বার্থের জন্য তাকেই ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে ভোলার মনপুরায় বদলি করা হলেও পরে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বদলি হয়ে আসেন সুচতুর মিজানুর রহমান। এখানে এসেও ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন মিজানুর রহমান।

আরও পড়ুন: লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করায় আলেম সমাজে অসন্তোষ

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। তিনি জানান, পারিবারিক রোষানলের কারণে তাকে জড়িয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সম্পদ যা আছে, তা নিজের উপার্জিত টাকায় করেছেন বলে জানান। তবে কীভাবে সামান্য টাকা বেতনের কর্মচারী এত টাকার মালিক বনে গেলেন, তার কোনো সঠিক উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিরত মিজানুর রহমান নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেলেও একসময় অভাব-অনটনে জীবনযাপন করেছেন। কোটি টাকা তো দূরের কথা, সংসার চালানোই রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো। তবে ক্লার্কের চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল তার অজানা। পরবর্তীতে টাকার নেশায় সরকারি পদ আর রাজনীতিকে ব্যবহার করে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

২০০০ সালে মিজানুর রহমান চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলায় অফিস ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন। পরে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় টাকা কামিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সাবেক এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় ২৪ বছর তিনি একই জায়গায় চাকরি করেছেন। দীর্ঘ সময়ে যতই বদলির অর্ডার এসেছে, তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম ব্যবহার করে বদলির আদেশ বাতিল করেছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হয়ে অবৈধভাবে কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়েছেন মিজানুর রহমান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজধানী ডেমরার রসুলনগর (পশ্চিম টেংরা) এলাকায় মিজানুর রহমানের রয়েছে পাঁচতলা বহুতল ভবন, যার আনুমানিক মূল্য সাড়ে ছয় কোটি টাকা। মিজানুর রহমানের স্ত্রীর নামে ঢাকায় প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। একটি শপিং কমপ্লেক্সে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার শেয়ার। মিজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার উত্তর ধনীকুন্ডা গ্রামে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনতলা বাড়ি। একই এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মার্কেট। প্রায় ৪৫০ শতাংশ কৃষিজমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া নামে-বেনামে আরও প্রায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার।

একজন সামান্য ক্লার্ক থেকে চল্লিশ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারী মিজানুর রহমান প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার মালিক কীভাবে বনে গেছেন, এই চিন্তা করলেই ওই এলাকার যে কারও চোখ চরকগাছে উঠে যায়।

টেলিফোনে কথা হয় বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, উপজেলায় কাজ করছেন এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তা অবৈধভাবে সম্পদ উপার্জন করে থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবীরের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।