বিচারিক আদালতের ১৬ মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বড় পরিবর্তন; চারজনের সাজা কমে যাবজ্জীবন

নুসরাত হত্যা: দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, ১০ জন খালাস

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৪১ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:১২ অপরাহ্ন, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং অপর ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন।

সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন: নুসরাত হত্যা মামলায় ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, যাবজ্জীবন ৪ জন

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং মাদ্রাসাছাত্র শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম।

মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

আরও পড়ুন: নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় ঘোষণা চলেছে

অন্যদিকে খালাস পেয়েছেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আবদুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

১৬ মৃত্যুদণ্ডের রায়ে হাইকোর্টে পরিবর্তন: 

নুসরাত হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিচারিক আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদনের জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। এসব আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার উচ্চ আদালত রায় দেন।

ফলে বিচারিক আদালতে সব আসামির মৃত্যুদণ্ডের যে অভিন্ন সাজা ছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা বহুলাংশে পরিবর্তিত হলো। দুই আসামির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকলেও চারজনের সাজা কমেছে এবং ১০ আসামি পুরোপুরি খালাস পেয়েছেন।

যে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল: 

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ছিলেন এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি। মামলার অভিযোগ ও বিচারিক কার্যক্রমে উঠে আসে, নুসরাতের সঙ্গে শ্লীলতাহানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর নুসরাত ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়ার বিষয়টি।

অন্যদিকে শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম ছিলেন হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নেওয়া আসামিদের একজন। তদন্তে তার দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের দিন নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যাওয়া, তাঁর হাত-পা বাঁধা এবং শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল: মাদ্রাসার ছাদে ভয়াবহ হামলা: 

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ছিল নুসরাতের জীবনের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার দিনগুলোর একটি। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন তিনি।

অভিযোগপত্র, সাক্ষ্য ও আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, সেদিন মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নুসরাতকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁকে ধরে ফেলে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়। পরে তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে গুরুতর অবস্থায় তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে চিকিৎসকদের কাছে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যও মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ঘটনার সূত্রপাত শ্লীলতাহানির অভিযোগে: 

মামলার পটভূমিতে ছিল ২০১৯ সালের ২৭ মার্চের ঘটনা। ওই দিন নুসরাতকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেছেন—এমন অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তে উঠে আসে, অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে মুক্ত করা এবং নুসরাতের করা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। নুসরাত ও তাঁর পরিবার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করায় তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলার তদন্তে বলা হয়।

পরবর্তী সময়ে নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান ওরফে নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

তদন্তে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র: 

নুসরাতের মৃত্যুর পর মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৮ মে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

তদন্ত শেষ করতে পিবিআইয়ের ৩৩ কার্যদিবস সময় লাগে। পরবর্তী সময়ে বিচারিক আদালতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে।

এরপর ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামির সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।

জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা: 

মামলার তদন্তে আসামি শাহাদাত হোসেন ও নূর উদ্দিনের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাঁরা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়ে তথ্য দেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নুসরাতকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রথমে চাপ দেওয়া হয়। তাতে তিনি রাজি না হলে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার দিন নুসরাতকে ছাদে নেওয়ার পর কয়েকজন মিলে তাঁকে মাটিতে ফেলে হাত-পা বেঁধে ফেলেন। পরে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

অগ্নিসংযোগের পর জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। নুসরাতের শরীরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।

বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আসামিদের ভূমিকা: 

২০১৯ সালের রায়ে বিচারিক আদালত আসামিদের পৃথক পৃথক ভূমিকা উল্লেখ করেছিলেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আসামিদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

মাকসুদ আলমের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অগ্নিসংযোগের জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগের কথাও বিচারিক আদালতের রায়ে উঠে আসে।

শাহাদাত হোসেনকে নুসরাতের হাত-পা বাঁধা এবং অগ্নিসংযোগে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জাবেদ হোসেনের বিরুদ্ধে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢালার অভিযোগ ছিল। সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়েরের বিরুদ্ধে নুসরাতের ওড়না ছিঁড়ে হাত-পা বাঁধা এবং আগুন ধরানোর ঘটনায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ ছিল।

উম্মে সুলতানার বিরুদ্ধে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নেওয়া ও হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরকা ও হাতমোজা সংগ্রহের অভিযোগ ছিল।

এ ছাড়া আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘটনাস্থল ও মাদ্রাসার বিভিন্ন প্রবেশপথে পাহারা দিয়ে হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

তবে হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের সেই সিদ্ধান্তের বড় অংশ পরিবর্তিত হয়েছে। ১০ আসামিকে খালাস এবং চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার মধ্য দিয়ে উচ্চ আদালত প্রমাণ ও আইনি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পৃথক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা: 

২০১৯ সালের বিচারিক রায় ঘোষণার সময় আদালত নুসরাত হত্যা মামলায় গণমাধ্যমের ভূমিকারও প্রশংসা করেছিলেন। রায় পড়ার শুরুতেই আদালত বলেছিলেন, গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশবাসীর সামনে ব্যাপকভাবে উঠে আসে।

নুসরাত হত্যাকাণ্ড সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি করে। একজন শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসার ভেতরে হাত-পা বেঁধে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।

দ্রুত তদন্ত ও বিচার: 

নুসরাত হত্যা মামলা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আলোচিত ফৌজদারি মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঘটনার পর দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া এবং স্বল্প সময়ে বিচারিক আদালতে বিচার শেষ হওয়ার কারণে মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

তবে বিচারিক আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানিতে মামলার প্রমাণ, আসামিদের পৃথক ভূমিকা এবং ফৌজদারি দায়ের আইনি মানদণ্ড নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। সেই মূল্যায়নের ফলেই ১৬ আসামির অভিন্ন মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনের খালাসের সিদ্ধান্ত এসেছে। 

নুসরাত হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায় শুধু একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারিক পরিণতিতে পরিবর্তন আনেনি; একই সঙ্গে ফৌজদারি মামলায় প্রত্যেক আসামির দায় পৃথকভাবে নির্ধারণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সাজা নির্ধারণের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

বিচারিক আদালতে একই মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতের পর্যালোচনায় সেই সাজা বহাল থাকেনি। এর ফলে মামলাটি এখন আরও উচ্চতর বিচারিক পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট পক্ষ চাইলে আইনানুগ পরবর্তী প্রতিকার গ্রহণ করতে পারবেন।