স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:১৪ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:১৪ অপরাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না এবং গুমের শিকার কোনো স্বজনকে প্রিয়জনের অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলতে হবে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

আরও পড়ুন: ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের ৪র্থ কমিটি গঠন, সভাপতি তাছবীর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শফিক

রাষ্ট্রপতি বলেন, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস এমন একটি দিন, যা গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের বেদনা ও অপেক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা জানান।

তিনি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না, একই সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, শান্তি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও বিপর্যস্ত হয়।

আরও পড়ুন: এনবিআরে বড় রদবদল, একযোগে বদলি ৩৬ অতিরিক্ত কর কমিশনার

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার কার্যত লঙ্ঘিত হয়।

গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ভিন্নমত প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে গুম করার অভিযোগ রয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম ও আটকের কথাও তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। তবে এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁদের পরিবার প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, গুম ও নির্যাতনের সংস্কৃতি সেই আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতীয় ইতিহাসের এই অধ্যায় অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসব অপরাধের বিচার বাংলাদেশেই হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগকে স্পষ্ট করে।

রাষ্ট্রপতি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয় ও আতঙ্কের সংস্কৃতি থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন, সেটিই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।

সবশেষে রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’

তিনি আরও বলেন, গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি যতই ক্ষমতাবান হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্র আন্তরিকভাবে দাঁড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।