অপ্রতিরোধ্য ঢাকায় ছিনতাই চক্র

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ন, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১১:১৭ অপরাহ্ন, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# ফ্লাইওভারের উপরে নিচে ভবঘুরে-ছিনতাই চক্রের বসবাস

# রাজধানীতে ছয় মাসেই ছিনতাইয়ের ১৭২ মামলা

আরও পড়ুন: ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা সরকারের

# এখন আর নির্ধারিত স্পট নয় সর্বত্রই  অভয়ারণ্য। প্রকাশ্যে দিনের বেলায়ও লুট করতে খুন করছে মানুষ 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কমিউনিটি পুলিশের সব ধরনের  অভিযানের মুখে এখনো অপ্রতিরোধ্য ঢাকার ছিনতাইকারী চক্র। কোনভাবেই তাদের দমন করা যাচ্ছে না। এখন আর কোন নির্দিষ্ট স্পট নয় প্রকাশ্যে দিনের বেলায় রাজধানী জুড়ে চিন্তাই এখন নিত্য দিনের ঘটনা।  ফ্লাইওভারে রাতের আঁধারে পথচারী-চালকদের গতিরোধ করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে ছিনতাই চক্র। তবে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলোতে পর্যাপ্ত বাতি ও সিসি ক্যামেরার অভাব, ভবঘুরে ও অপরাধী চক্রের অবাধ বিচরণের কারণে দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধী ও ছিনতাই চক্র ফ্লাইওভারের ওপর এবং নিচের পরিত্যক্ত অংশগুলোকে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এই চক্রটি দীর্ঘদিন যাবত ফাঁকা পিলারের সুড়ঙ্গ, অভিনব আস্তানা- সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা,চক্রের নারী সদস্যরা ফ্লাইওভারের ওপর পথচারী বা চালকের সাহায্য চাওয়ার মধ্যদিয়ে ভুল পথ দেখিয়ে  মতো কৌশলে সবকিছু হাতিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে ফ্লাইওভারের এক পাশ থেকে অন্য পাশে শক্ত নাইলনের সুতা বা তার বেঁধে রাখা হয়। দ্রুতগতির বাইক এই সুতায় আটকে চালক পড়ে গেলে মুহূর্তের মধ্যে তার মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন: বাংলামোটরে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর নিয়ে খবরে ডিএমপির ভিডিও দেখিয়ে স্পষ্টীকরণ

এছাড়াও রাজধানীতে ভোরের ব্যস্ত সড়ক, দিনের আলো, বাসস্ট্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনের সড়ক কিংবা যানজটে আটকে থাকা গাড়ি—সুযোগ পেলেই ছোবল দিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। কখনো চাপাতি ঠেকিয়ে, কখনো চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ টেনে, আবার কখনো যাত্রী সেজে চালককে অচেতন করে সর্বস্ব লুট করছে সংঘবদ্ধ চক্র।

‘বাঁচতে চাইলে সব দে’, যাত্রাবাড়ীতে অপরাধের শিকার পথচারি: যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তার অভাবে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী ৪ লেন মহাসড়ক ও এর আশেপাশের এলাকায় গত কয়েক মাসে দুই শতাধিক ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। রাতে বা ভোরে এই অঞ্চলের সড়কগুলো প্রায়ই জনশূন্য থাকে, যার সুযোগ নেয় অপরাধীরা। রাঙামাটি থেকে বাসে ঢাকায় এসেছেন চিকিৎসক শামসুন্নাহার হেনা। তিনি নেমেছেন যাত্রাবাড়ীতে। নামেন যাবেন চাঁদপুরে। ভোরের লঞ্চ ধরতে রিকশায় যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা দেন সদরঘাটের উদ্দেশে। শামসুন্নাহার বলেন, যাত্রাবাড়ী মোড়ের কাছে তিনজন ছিনতাইকারী রিকশাটি থামায়। তাদের একজন রিকশাচালকের গলায় চাকু ধরে, অন্যজন তাঁর (শামসুন্নাহার) গলায়। আরেকজন সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগে কী কী আছে, তা জানতে চায়। শামসুন্নাহার বলেন, তারা আমার গলায় চাকু ধরে বলে, জান বাঁচাইতে চাস, নাকি মাল চাস? বাঁচতে চাইলে সব দে। তখন আমি ভয়ে ভয়ে বলি, জান চাই। তারপর ওরা ফোন, লাগেজ—সবকিছু নিয়ে যায়। ১২ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ফরিদপুর থেকে গাড়িতে যাচ্ছিলেন রাজু শেখ। গাড়িটি যখন যাত্রাবাড়ীর মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে (উড়ালসড়ক) উঠছিল, তখন কিছুটা যানজটে পড়ে। উড়ালসড়কে রাজু শেখের গাড়ির সামনে থাকা অন্য একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এক ব্যক্তি। গাড়িটির চালক ও যাত্রীরা তা দেখে ফেলেন এবং নেমে ওই ব্যক্তিকে কয়েকটি কিলঘুষি দিয়ে ছেড়ে দেন। ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। চালক ও যাত্রীরা আবার গাড়িতে উঠতেই ওই ব্যক্তি তাঁদের গাড়ির পিছু নেন। এ ঘটনার কিছু অংশ ভিডিও করেন রাজু শেখ। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন তিনি। রাজু শেখ বলেন, সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল যে ছিনতাইকারীকে ধরে মারধর করার পরও সে ভয় পাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আশপাশে তার সাথে আরও কয়েকজন যুক্ত রয়েছে। নইলে এত সাহস নিয়ে এমন কাজ করার কথা নয়। তিনি বলেন, নিয়মিত এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি, এমন ঘটনা প্রায়ই দেখি। তবে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজুর দাবি, ছিনতাইকারীদের কেউ প্রশ্রয় দেয় না। তারা ভাসমান। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছিনতাই করে চলে যায়। তিনি বলেন, আমরা ছিনতাই কমাতে অভিযান পরিচালনা করি। আগের থেকে অপরাধ অনেকটাই কমে এসেছে। ছিনতাইকারীদের ধরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়। বান্দরবানে যাওয়ার উদ্দেশে ১২ আগস্ট সায়েদাবাদ থেকে বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী এস আল আমিন। তিনি বলেন, বাসটি রাত ১০টার দিকে সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ীতে যায়। তার আগেই বাসের সুপারভাইজার সতর্ক করেছিলেন যে জানালা দিয়ে মুঠোফোন ও গয়না ছিনতাইয়ের চেষ্টা হতে পারে। বাসের জানালা বন্ধ রাখতে হবে। যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়েও কয়েকটি কোম্পানির দূরপাল্লার বাস থামে। এসব বাসের যাত্রীদের মুঠোফোন ও গয়না ছিনিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা ঘুর ঘুর করে। আল আমিন বলেন, আমরা জানালা বন্ধ রেখেছিলাম। যাত্রাবাড়ীতে ৭ থেকে ৮ বার বাইরে থেকে আমাদের বাসের জানালা খোলার চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। কিন্তু খুলতে পারেনি। আমরা দেখলাম, ওই ব্যক্তিই সামনের বাসের জানালা দিয়ে একজনের মুঠোফোন ছোঁ মেরে নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। আশপাশে পুলিশ থাকার পরও এমন ঘটনা ঘটল। ১৬ আগস্ট দুপুরে জনপদ মোড়ে এক ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন চায়ের দোকানদার শরীফুল মিয়া। বলছিলেন, আর দেখলে পা ভেঙে দেবেন। তিনি বলেন, এরা ছিনতাইকারী। দেখছেন না ঘুর ঘুর করছে! চুপ করে বসে থেকে ফোন টান দিয়ে নিয়ে দৌড় দেবে। এরা আমাদের ব্যবসার বদনাম করে। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় কাওসার হাওলাদারকে ছিনতাইকারীরা খুন করে বলে পুলিশ বলছে।কয়েকদিন আগে  ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদার নিহত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই যুবককে নিয়ে আসা অটোরিকশাচালক ইসরাফিল সাংবাদিকদের বলেন, যাত্রাবাড়ী বাসস্টেশন এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ওই যুবক হাতেনাতে ধরা পড়েন। পরে ওই নারী তাঁকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে চলে যান। এরপর সেখানে উপস্থিত লোকজন ওই যুবককে পিটুনি দেন। কুড়িগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী পিংকি পরিবহনের একটি বাস গত ২৫ মে রাতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে। বাসটির সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে পরদিন মামলা করেন। মামলায় উল্লেখ করা হয়, বাসটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ৩৬ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসে। রাত দুইটার দিকে বাসটি শনির আখড়া পার হওয়ার পরপরই ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতেরা বাসে উঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখায় এবং যাত্রীদের কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও গয়না নিয়ে যায়। বাসের সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক ১৭ আগস্ট বলেন, এ রাস্তা খুবই ভয়ংকর। কিন্তু কিছু করার নেই। তাঁদের বাস নিয়ে রাস্তায় নামতেই হয় এবং ঢাকায় যেতে হলে যাত্রাবাড়ী এলাকা পার হতেই হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে। এর মধ্যে ওয়ারী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ৩৮টি এবং তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ৩৪টি মামলা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা হয় না; অনেক ভুক্তভোগী জিডি করেন, কেউ আবার কোনো অভিযোগই করেন না। জুলাই ও আগস্টের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা শুধু স্থানই বদলায়নি, বদলেছে তাদের কৌশলও। জুলাইয়ের শুরুতেই ধানমন্ডিতে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা সামনে আসে। গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে চার ছিনতাইকারী দুই বন্ধুর রিকশার গতিরোধ করে গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে দুটি দামি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। বাধা দেওয়ায় একজনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে ৩ জুলাই অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। 

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করছিল। এর কয়েক দিন পরই সামনে আসে আরও ভয়ংকর কৌশল। ওয়ারী এলাকায় যাত্রী সেজে অটোরিকশাচালকদের অচেতন করে ছিনতাই করছিল একটি চক্র। ২৮ জুন রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাচালক দিদারুল ইসলাম ২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে ৮ জুলাই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই করা অটোরিকশা, অপরাধে ব্যবহৃত সিএনজি ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ, জুলাইয়ের ঘটনাগুলোতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ছিনতাইকারীদের একটি অংশ সরাসরি অস্ত্র দেখিয়ে লুট করছে, আরেকটি চক্র যাত্রী সেজে পরিবহন চালকদের টার্গেট করছে। সর্বশেষ আগস্টে ছিনতাইয়ের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে। চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসা প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন (৫৬) ২৯ আগস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে অটোরিকশায় যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর র‌্যাব-২ মূল সন্দেহভাজন পনি ওরফে ‘প্যারা পনি’সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। তবে ব্যাগটি সরাসরি কে টেনেছিল, তা তদন্তে এখনো নিশ্চিত হয়নি। একই সময়ে কদমতলীতে ছিনতাইকারীদের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষে এক ছিনতাইকারী ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে ছিনতাইচক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের আরেকটি দিক সামনে আসে। তবে আগস্টে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকা। ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট সরেজমিনে মানুষের সঙ্গে কথা বলে ছিনতাইকারীদের সক্রিয়তার চিত্র পেয়েছে প্রথম আলো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুযোগ পেলেই ছিনতাই করছে অপরাধীরা; গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে অনেকে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত ১২ আগস্ট মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে যানজটে থাকা গাড়ির যাত্রীদের সামনে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, ১৬ আগস্ট জনপদ মোড়ে দূরপাল্লার বাসের জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেওয়ার চেষ্টা এবং ১৭ আগস্ট মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা-মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ—এসব ঘটনা ওই এলাকার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়কের অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডকে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়ক, মানুষের বেশি চলাচল এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব স্থান অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। ভোর ও সন্ধ্যায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

ডিএমপির পরিসংখ্যান বলছে, ছয় মাসে ৪০২ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, শুধু গ্রেপ্তার করে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। একই ধরনের চক্র বারবার সক্রিয় হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী জামিনে বেরিয়ে অপরাধে ফিরছে। এখন প্রয়োজন অপরাধপ্রবণ এলাকাভিত্তিক ‘ক্রাইম ম্যাপিং’, সিসিটিভি নজরদারি, মোটরসাইকেলভিত্তিক ছিনতাইকারী চক্র শনাক্তকরণ এবং বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ জুলাইয়ের চাপাতি, ওয়ারীর অজ্ঞানপার্টি থেকে আগস্টের মোটরসাইকেল ছিনতাই—সবশেষে সংসদ ভবনের সামনে একজন প্রধান শিক্ষিকার মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, রাজধানীতে ছিনতাই এখন শুধু সম্পদহানির অপরাধ নয়; এটি নাগরিকের জীবননিরাপত্তারও বড় হুমকি।

ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী চালক-যাত্রীরা বলছেন, ফ্লাইওভারগুলোতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ছাড়াও ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিরাপদে যাতায়াতে সব সময় আতঙ্কে থাকেন তারা। বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ বলছে, ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ কমাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে।

নগরবাসীর সুবিধার্থে রাজধানীতে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো, মহাখালী ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, টঙ্গী ফ্লাইওভার ও মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার। অব্যবস্থাপনা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফ্লাইওভারগুলো ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। এর মধ্যে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে যান চলাচল বেশি থাকায় তুলনামূলক কম দুর্ঘটনা ঘটে। তবে, যানজটে গাড়ি থামলে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে অনেকে। নির্জনতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকসেবনে সক্রিয় রয়েছে নানা অপরাধী। এছাড়া ফ্লাইওভারের নিচেসহ আশপাশ ও রেললাইন ঘিরে থাকা ভাসমান ছিন্নমূল কিশোর ও লোকজনদের অধিকাংশই মাদক সেবন এবং ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধীরা যাতায়াতকারীদের টার্গেট করে মোবাইলফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। ফ্লাইওভারের পিলারের উপরে থাকা ফাঁকা স্থানও ছিন্নমূল ও ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিণত হয়েছে। 

ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও মুখপাত্র মো. আকতার হোসেন বলেন,  ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টহল বাড়ানো হয়েছে।