তিস্তা-পদ্মার পানির হিস্যা আদায়ে যত দূর যেতে হয়, যাব
নির্বাচনে ভোট দেওয়া বা না দেওয়ার পার্থক্য না করে সব নাগরিকের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকার এমনভাবে কাজ করতে চায়, যাতে যারা সরকারকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের পাশাপাশি যারা ভোট দেননি, তাঁরাও সরকারের সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পান। একই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রী রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। দুপুর পৌনে ১টার দিকে রংপুর নগরের ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন শেষে বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মন্দির পরিদর্শনকালে তিনি মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন। এর আগে দুপুর ১২টার দিকে নগরের প্রেস ক্লাব এলাকায় অবস্থিত মন্দিরে পৌঁছে পূজার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দেশের সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এ দেশে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। আগামী হাজার বছরও যেন সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সে পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, আগামী দিনে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে সব ধর্মমতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
সব এলাকা ও মানুষের জন্য সমানভাবে কাজ করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমবণ্টনের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায় সরকার। রংপুর মহানগরের উন্নয়নে একটি বৈঠকে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরকে ওএসডি
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। সেতু, কালভার্ট, স্কুল-কলেজসহ প্রয়োজনীয় স্থাপনা পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করা হবে, যাতে মানুষ রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।
এসব কাজ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধিরা সংসদে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন। সেখানে জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে যে সিদ্ধান্ত ভালো হবে, তা আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণ করা উচিত।
রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে জনজীবন ব্যাহত না করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিতে যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষ স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। সরকার এ লক্ষ্যেই কাজ করছে। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, একটি মহল বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে বিতর্কিত করার চেষ্টা জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ উল্লেখ করে তিনি তাঁদের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
মন্দিরের পেছনে নির্মাণাধীন একটি স্থাপনার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী অসচ্ছল মানুষের বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে এসে যাঁদের থাকা কষ্টকর, তাঁরা এই সুবিধা পাবেন বলে জানান তিনি।
স্থাপনাটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে আরও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এ কাজ আগামী দুই বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শেষ করার জন্য সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সামরিক বিমানে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরে যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। ধর্মসভা মন্দিরে পৌঁছানোর সময় সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে রংপুর নগরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি গত পাঁচ দিন ধরে নগরের বিভিন্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারকাজ চলে। রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক এবং নগরের ডিসির মোড় থেকে লালকুঠির মোড় পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১৫০ মিটার সড়ক সংস্কার করা হয়। তবে সফরের আগে দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করায় কাজের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রংপুরের কর্মসূচি শেষে একই দিনে রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি ছিল প্রধানমন্ত্রীর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায়। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা না করে কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরা উচিত। তিনি বলেন, কিছুদিন যাবৎ আমরা দেখছি—বর্তমান সরকার যে ঐক্য তৈরি করতে চাচ্ছে, সবাইকে নিয়ে যেখানে চলতে চাইছে, সেখানে একটি মহল বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু দেশের মানুষ তা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। একইভাবে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকেও কোনো কোনো মহল বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, গণতন্ত্রকামী সব জনগণকে একসঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে বলতে চাই, চব্বিশের ছাত্র-জনতার যে গণঅভ্যুত্থান, সেটিকে দয়া করে আপনারা বিতর্কিত করবেন না। কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে সংসদে তা তুলে ধরুন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ তাঁদের প্রতিনিধিদের সংসদে পাঠিয়েছে। সেখানে বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে জনগণ এবং রাষ্ট্রের জন্য যা ভালো, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি সরকার হতে চায়, যে সরকারকে ভোট দিয়েছে, তাদেরও সরকার হতে চায়; যারা ভোট দেয়নি, তাদেরও সরকার হতে চায়।
সব এলাকার উন্নয়ন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সুষমভাবে করতে চায় সরকার। রংপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য দুই সপ্তাহ আগে একটি সভায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পরিষদকে কাজে লাগিয়ে রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় সেতু, কালভার্ট, স্কুল-কলেজসহ যেসব অবকাঠামো দরকার, সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার মানুষ যেন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পান, সে বিষয়ে সরকার কাজ করতে চায়। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী দিনে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সব ধর্ম ও মতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। পারস্পরিক ঐক্য বজায় রেখে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে পারলেই দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে। এ জন্য সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রয়োজন।
একদল সীমান্তের ওপার থেকে পয়সা দিচ্ছে, আরেক দল দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে: পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসররা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে এবং জনজীবনকে অস্থিতিশীল করতে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যে স্পষ্ট হয়েছে, একদল সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, আর দেশে বসে থাকা অপর একটি চক্র কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন অপতৎপরতা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে।
মঙ্গলবার রাজশাহীতে আখচাষিদের মধ্যে সরকারি প্রণোদনার অর্থ বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে—যে স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তারা সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ পাঠাচ্ছে এবং তাদের দোসররা সেই টাকায় দেশের ভেতরে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিভিন্ন কলকারখানায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে যারা মিথ্যা কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং টিকিট বিক্রির রাজনীতি করেছিল, তাদের কর্মকাণ্ড জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন সেই পক্ষগুলোই আবার এক হয়ে দেশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে সক্রিয় হয়েছে।
দেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিদেশ থেকে এসে কেউ আমাদের দেশ গড়ে দিয়ে যাবে না। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করে নিজেদেরই ভাগ্য বদলাতে হবে।
জনসভায় তিনি উত্তরাঞ্চলের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে তিস্তা ও পদ্মা নদীতে শিগগিরই ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু ও শেষ করার জোরালো প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া, কৃষকদের সুরক্ষায় ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু এবং প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশ গড়ার কাজে বিএনপি সরকারের পাশে থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘করব কাজ, গড়ব দেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে বক্তব্য শেষ করেন।
তিস্তা ও পদ্মার পানির হিস্যা আদায়ে যত দূর যেতে হয়, যাব: তিস্তা ও পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে পানির সমস্যা দূর করা হবে এবং পানির হিস্যা আদায়ে যত দূর যাওয়া প্রয়োজন, তত দূর যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে ১৪ জেলার মানুষ উপকৃত হবে। তবে এ জন্য বিএনপির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, এ দেশ আমাদের, এ দেশ আমাদেরই গড়তে হবে। বিদেশ থেকে কেউ এসে দেশ গড়ে দেবে না। কুচক্রী মহল সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। উন্নয়নের গতিকে কেউ যাতে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের স্লোগান—‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এতে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। এ কারণে আট মাস আগে নির্বাচনী জনসভাগুলোতে বিএনপি সরকার গঠন করলে কী কী করবে, তা তুলে ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সাত দিনের মাথায় ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি কৃষক কার্ড দিতে চায়। এ কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, প্রান্তিক ও বড় কৃষকদের কাছে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। অন্তত একটি ফসলের জন্য সার, বিষ ও কীটনাশক সরবরাহের চেষ্টা করা হবে, যাতে কৃষকদের কষ্ট লাঘব হয়।
এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা বিমা করতে পারবেন, ব্যাংকঋণ নিতে পারবেন এবং আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি না, তা-ও জানতে পারবেন। কৃষক কার্ডে ১০টি সুবিধা থাকবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, কৃষি ও কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। উত্তরাঞ্চল দেশের শস্যভান্ডার। এ অঞ্চলের কৃষকেরা পানির সংকটে ভোগেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ে বরেন্দ্র প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে খাল ও নদী খনন শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর মধ্যে ৮ হাজার কিলোমিটার খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে মানুষ পানি ও সেচের সুবিধা পাবে। ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও হবে।
রাজশাহীর হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় নেতারা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন। বর্তমানে শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩০০। সেটি ২ হাজার ৫০০ করার প্রস্তাব এসেছে। বিএনপি জনগণের সরকার। দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পাঁচ বছরের মধ্যে উপজেলা হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান ৩০ শয্যার হাসপাতাল চালু করেছিলেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া আরও ২০ শয্যা বাড়িয়ে সেটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। এবার ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এতে গ্রামের মা-বোনদের চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না। বিএনপি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। কিডনি রোগীসহ সবার জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, জুন মাসে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। ডায়ালাইসিসের ওষুধের দাম কমানো হয়েছে। হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সরঞ্জামের ওপর কর কমানো হয়েছে। জনগণের জন্য বিএনপি কাজ করছে।
চিকিৎসার পাশাপাশি ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ হয়ে থাকা প্রায় ৪৬টি কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ বেকার না থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি মহল বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বিএনপি দেশের নিরাপত্তা বাড়ানো, বন্ধ কারখানা চালু করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছে। বেকারত্বের অভিশাপ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করছে, যাতে বেকারদের কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু কয়েকটি দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং সরকারের কাজ বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা এ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে চায়, তারা কি জনগণের বন্ধু? তারা জনগণের বন্ধু নয়।
তারেক রহমান আরও বলেন, খাল খনন জনগণের কর্মসূচি। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের বিরোধিতা করা হচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়িত না হলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া মা-বোনদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা বিনা মূল্যে করেছিলেন। বিএনপি মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভালো ফল করলে উপবৃত্তির ব্যবস্থাও করা হবে। শুধু শিক্ষা দিলেই হবে না, মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে, যা সংসারের কাজে লাগবে। এ সহায়তা দিয়ে পুঁজি গড়ে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে পুরো বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, একটি দল এসব উদ্যোগ চায় না। জনগণ আর তাদের কথায় বিশ্বাস করে না। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপি একাত্তর ও চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করে। এ কারণেই দলটি শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, একটি দল মুখে চব্বিশের চেতনার কথা বললেও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাতে তাদের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। তারা চব্বিশের আন্দোলনের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। মুখে এক কথা বলছে, কাজে করছে আরেকটি। জনগণ স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান চায়। বিএনপির স্লোগান—‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা মিথ্যা কথা বলে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করেছিল। এখন সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। আজ থেকেই সবাইকে সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।
এ সময় ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মধ্যে ১২ কোটি ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা কৃষি প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে বোতাম চেপে তিনি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। কৃষকদের মুঠোফোনে টাকা পৌঁছানোর পর তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন। জনসভায় উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে সাড়া দেন। এ সময় নেতাকর্মীরা তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
দুর্গাপূজার আয়োজনে যোগ দিতে চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী: শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজনে অংশ নিতে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দলীয় সাংগঠনিক সভায় অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর এই সফর ঘিরে নগরে তৈরি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা। মঙ্গলবার রাত ৭টা ৪০ মিনিটে সামরিক উড়োজাহাজে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপির সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ অন্যরা।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানান বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, চট্টগ্রাম বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী নগরের রহমতগঞ্জে জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যান। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
পূজামণ্ডপের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সব কর্মসূচি শেষ করে রাতেই ঢাকায় ফেরার কথা তাঁর।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক উড়োজাহাজে সৈয়দপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন তারেক রহমান। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সেখানে পৌঁছে সড়কপথে রংপুরে যান তিনি। যাত্রাপথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে দুটি পথসভায় অংশ নেওয়ার পর রংপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে সামরিক উড়োজাহাজে রাজশাহীতে পৌঁছান তিনি। সেখানে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় অংশ নিয়ে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এরপর রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে পৌঁছান তারেক রহমান।





