বিআরটি প্রকল্প নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড

Shahrier Islam Pallab
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:৩৬ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৭ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ঢাকা থেকে গাজীপুরে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন যাতায়াতের স্বপ্ন দেখিয়ে ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করে পরের বছর বাস চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে চালু হয়নি বিশেষ বাসসেবা। উল্টো দীর্ঘ নির্মাণযজ্ঞে যানজট, ধুলাবালি ও জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। পরিকল্পনা ও নকশার ত্রুটি, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগের মধ্যে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

এবার প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে অবকাঠামোর ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার দাবি তুলে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়, দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ আর বাস্তবায়ন ব্যর্থতার দায় কার—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন: কক্সবাজার সৈকতে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ২

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক পত্রে সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে।

বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ফ্যাসিস্ট ও গুপ্তরা মিলে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে: জহির উদ্দিন স্বপন

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া; ২. অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা; ৩. বিআরটি পথটি যেভাবে আছে, সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া; ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা। শেষে সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন ও বিআরটি লেন আলাদা করার জন্য নির্মিত বিভাজক ভেঙে ফেলতে হবে। উড়ালপথ ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করা হবে।

অবশ্য বিআরটি প্রকল্প সম্পন্ন করে তা দিয়ে বিশেষ বাস চালানোর দাবি জানিয়ে আসছে গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন নামে একটি সংগঠন। তারা প্রকল্পের পক্ষে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক বলেন, গত ১৪ বছর গাজীপুরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর তা বাতিল করা ঠিক হবে না। তাঁরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দেবেন বলে জানান।

বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। গত বছরের অক্টোবরে তাঁরা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে।

প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে দলটি। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও বলা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথটি সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে বিদ্যমান বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি লেনে স্টেশনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে বাসের দরজা হতে হবে ডান দিকে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিআরটি লেনে দরজা ডান দিকেই থাকে। ডান দিকে দরজাওয়ালা বাস চালু করলে ওই বাসগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দরের বাইরে চলতে পারবে না।

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে প্রকল্পটি বাতিল করা। তবে ১৪ বছর গাজীপুরবাসীসহ এই পথে যাতায়াতকারীরা দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা উচিত।

তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলে গাজীপুরবাসী শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারতেন। তাঁদের পুনরায় বাস বদল করতে হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়। সামছুল হক বলেন, প্রকল্পটি বাতিল করে এটিকে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীদের সুবিধা হবে। পাশাপাশি গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেনসেবা চালু করা যেতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ। সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্প চালু হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলে বলা হয়েছিল। বাসগুলো যানজট, সিগন্যাল কিংবা অন্য বাধায় আটকে থাকবে না—এমনটাই ছিল প্রত্যাশা।

মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি এতে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

২০২৫ সালে প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প খুঁজতে এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে।

বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্প বাতিল করার ফলে স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্র অন্য কোনো স্থানে ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে সওজের।

এই সড়ক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে থাকে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে করা হয়নি। ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলার সময় যানবাহন সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।

প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল তিনটি সরকারি সংস্থা—সওজ, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু বিশেষ বাস কেনা হয়নি বলে তাঁদের কাজ সীমিত। এখন এই কোম্পানি বিলুপ্ত করে সওজের আওতায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বুয়েটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকাও পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে প্রকল্প বাতিলের আর্থিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি)। তারা গত বছর এক সেমিনারে বলেছে, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকায় প্রকল্প বাতিল করা ঠিক হবে না। তাদের হিসাবে, প্রকল্প বাতিল হলে স্টেশন, র‍্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে।

এদিকে, ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং এর পেছনের কারণ জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম। প্রকল্পে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

ফোরামের মতে, গাজীপুরসহ এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী ১৮ জেলার মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গতকাল এক বিবৃতিতে ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর ও উত্তরা এলাকার মানুষ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে যানজট ও যাতায়াতের ভোগান্তি সহ্য করছেন। এত দীর্ঘ সময় দুর্ভোগ পোহানোর পর প্রকল্পটি বাতিল এবং নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ৩+৩ লেনের মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত তাঁদের নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, কেন প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এর পেছনে কী যুক্তি রয়েছে এবং এতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত কি না, তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি, পরিকল্পনাগত ত্রুটি কিংবা অর্থের অপচয় হয়ে থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে তদন্তের ফল জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

তবে প্রকল্পের কোনো দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধনের বিকল্প বিবেচনা না করে হঠাৎ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলা কতটা যৌক্তিক, তার ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।

ফোরামের নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হলে সংশ্লিষ্ট সড়কে যানজট ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এতে গাজীপুর ও উত্তরা এলাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি এই সড়ক ব্যবহারকারী ১৮ জেলার যাত্রী ও পণ্য পরিবহনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার আগে এর ব্যবহারযোগ্যতা, নতুন নির্মাণের ব্যয় এবং বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি।

বিবৃতিতে তাঁরা আরও বলেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর মানুষ এমন একটি কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, যা যাতায়াতের সময় কমাবে এবং যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে। শেষ মুহূর্তে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, আর্থিক দায় ও যোগাযোগব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা উচিত।

ফোরামের নেতারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিআরটি প্রকল্প বাতিল ও নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। গাজীপুরের মানুষের ১৪ বছরের দুর্ভোগ এবং ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।