এসআরবি পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে অপহরণ

চার দিন চোখ বাঁধা, পাঁচ দিন পরপর মিলত খাবার

Shahrier Islam Pallab
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫:৪৩ অপরাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২:৩৪ পূর্বাহ্ন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
অপহরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবিঃ সংগৃহীত
অপহরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয় আসামিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবিঃ সংগৃহীত

চোখ ও দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় একের পর এক জায়গায় নেওয়া হচ্ছিল তাকে। কখনো মারধর, কখনো গালিগালাজ; ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। এভাবে কেটে যায় চার দিন। এর মধ্যে পরিবারের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। অবশেষে প্রায় পাঁচ দিন পর বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশ থেকে অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে উদ্ধার করে পুলিশ।

হাসানের বর্ণনা অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাকে প্রায় পাঁচ দিনের মধ্যে মাত্র একবার খাবার দিয়েছিল। উদ্ধারের সময়ও তার চোখ বাঁধা ছিল। পুলিশ নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর বুঝতে পারেন, তিনি অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন: সহিংসতা ছাড়াই উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে বসে ছিলেন হাসান। 

এ সময় কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা চার ব্যক্তি দোকানে ঢোকেন। তাদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা বলেন, হাসানের নামে মামলা আছে। তাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে

আরও পড়ুন: দাম্মাম ও রিয়াদ রুটে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

এরপর হাসানের দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। দোকান থেকে বের করে তাকে তোলা হয় সিএনজিচালিত অটোরিকশায়। কয়েক দফায় যানবাহন বদলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজারের দিকে। শুরু হয় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আটকে রেখে নির্যাতন। অন্যদিকে হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা।

প্রবাস থেকে ফিরে ব্যবসা শুরু

হাসান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর মোজাম্বিকে ছিলেন। প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে বাঁশখালীর প্রেমবাজারে হার্ডওয়্যারের ব্যবসা শুরু করেন। সেই দোকান থেকেই তাকে তুলে নেওয়া হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপহরণের পর হাসানের ভাই মো. হোছাইম বাঁশখালী থানায় এজাহার দিলে মামলা হয়। তবে মুক্তিপণের জন্য ফোন করা হচ্ছিল ভিওআইপি নম্বর থেকে। ফলে শুরুতে অপহরণকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরে প্রেমবাজার থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পাশাপাশি স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলে।

এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকায় হাসানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ জানায়, ক্যাম্পের ভেতরে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে থাকা সহযোগীদের ফোন করানো হয়। মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ফেরত দিতে হবে, এমন কথা বলে তাকে ক্যাম্পের বাইরে আনা হয়। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।

চাকরিচ্যুত সাবেক র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন চাকরিচ্যুত সাবেক র‍্যাব সদস্য সুমন মুন্সি। অন্যরা হলেন, মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, আব্বাস উদ্দিন এবং ছলিম ওরফে সেলিম।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সুমন মুন্সি আগে র‍্যাবে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, ভুয়া ‘এসআরবি’ পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন সুমন। চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে তাকে জানাতেন। বাঁশখালীর আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয় করতেন। আর ছলিম ওরফে সেলিম টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা হওয়ায় ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

উদ্ধারের পর হাসান পুলিশকে জানান, অপহরণকারীরা তাকে কয়েকটি স্থানে আটকে রেখে মারধর করেন। চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় রাখা হয় তাকে। প্রায় পাঁচ দিনের মধ্যে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল। উদ্ধারের সময়ও তার চোখ বাঁধা ছিল।

পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। হাসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাকে অভিযানের বড় সাফল্য বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।