দৃঢ়চেতা খালেদার স্মরণ করে সংকটময় সময়ে ঐক্যের আহ্বান

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:৩৭ অপরাহ্ন, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৭ অপরাহ্ন, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নীতির প্রশ্নে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা মনোভাব, তার প্রতিহিংসার বদলে শান্তির বার্তা মনে রেখে সংকটময় সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান এসেছে তার নাগরিক শোকসভা থেকে।

শুক্রবার বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভায় নানা শ্রেণি–পেশার প্রতিনিধি ও মানুষের কাছ থেকে এই আহ্বান আসে।

আরও পড়ুন: জামায়াতের সাথে ইসলামী দলগুলোর নতুন করে মৌলিক বিরোধ

খালেদার ছেলে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সপরিবারে অংশ নেন ওই শোকসভায়। বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও যোগ দেন ওই শোকসভায়।

শোকসভায় সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন বলেন, “আমার বিবেচনায় তিনি একজন বিচক্ষণ, তিনি সত্যিকারে একজন দেশনেত্রী। তার রাজনৈতিক জীবন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবস্থান, ব্যক্তিগত ত্যাগ ও জাতীয় ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইসলামী আন্দোলনের সব অভিযোগের জবাব দিলো জামায়াত

দেশে রূপান্তরের এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “যদি আমাদের সবাই মনে রাখতে হয়—আক্রোশের বশে, মিথ্যাচার করে, যত মানুষে–মানুষে অনৈক্য ও বিবাদ সৃষ্টি করা যায়, সেভাবে তাদেরকে একত্রিত করা যায় না। কাজেই প্রতিহিংসা প্রবণতা দূর করতে হবে, মিথ্যা বলার অভ্যাসের আসক্তি দূর করতে হবে।”

ব্যক্তিগত জীবনে খালেদা জিয়ার অসাধারণ দৃঢ়চেতা মনোভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত বেদনা ও কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা ভুলে যেতে পারি না, তিনি প্রতিহিংসামূলক মামলায় দীর্ঘদিন কারাবাসে ছিলেন, যা আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।

“সেই কারাবাস ছিল শুধু একজন নেত্রীর নয়, এটা একজন বড় নেত্রীর গণতান্ত্রিক সময়ের বন্দিত্ব। কিন্তু কারাগারের পর তার বক্তব্য অত্যন্ত রাষ্ট্রনায়কসুলভ ছিল, তা আপনারা বিভিন্ন বক্তব্যে শুনেছেন।”

সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, “তিনি বলেছেন—ধ্বংস নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা ও শান্তির সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রের গর্জন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস—যে জাতি প্রতিহিংসার বদলে সহনশীল হয়, সেই জাতিই প্রকৃত সভ্য ও অগ্রসর জাতি।”

নাগরিক শোকসভা প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, “আমাদের প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন গত ৩০ ডিসেম্বর। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ, এই জনপদের মানুষ তাকে অনন্তকাল ধরে স্মরণ রাখবে তার দেশপ্রেম, সাহসিকতা, সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ, অত্যাচার সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতার জন্য। তিনি এই দেশকে ভালোবাসতেন।”

এই জনপদকে ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন এ দেশের তৃণলতা, ফুল-পাখি এবং পানি। এই পানির জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন।

তিনি বলেন, “আজকে এখানে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে তার তিনটি উক্তি, অমর বাণী আমরা চিরকাল মনে রাখব। যতদিন বেঁচে থাকি ততদিন মেনে রাখব।

এক. দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই।

দুই. আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, ওদের হাতে বন্দির শৃঙ্খল।

তিন. দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, দেশই আমার শেষ ঠিকানা।

“এই মন্ত্রগুলো তিনি দিয়ে গেছে, আর এই মন্ত্রগুলো ধারণ করলেই তার দল এবং এই দেশ রক্ষা পাবে। অন্যথায় রক্ষা পাবে না।”

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সময়ের মৃত্যু হয়নি, ইতিহাসের মৃত্যু হয়নি। আগামী দিনের যে ইতিহাস এই জনপদে সৃষ্টি হবে, তার প্রপেলার হবেন, তার ড্রাইভিং ফোর্স হবেন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার আদর্শ। তার আদর্শ চির অমলান থাকুক, চিরঞ্জীব থাকুক। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। মৃত্যুকে তিনি জয় করেছেন।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, “আল্লাহর কাছে হাজার শোকর, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশের মানুষ আজকে স্বাধীনভাবে ঘৃণাও প্রকাশ করতে পারছে, স্বাধীনভাবে ভালোবাসাও প্রকাশ করতে পারছে। এইজন্য এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের ঠাঁই হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।”

তিনি বলেন, “বেগম যখন জীবিত ছিলেন, আমি উনার জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রামে একটা কথা বলতাম, বেগম জিয়া ভালো থাকলে ভালো থাকবে বাংলাদেশ। আমি বিশ্বাস করি অবশ্যই উনি এখন ভালো আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ কি ভালো আছে বা ভালো থাকবে? যদি বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হয়, তাহলে বেগম জিয়াকে ইন্টারনালাইজ করতে হবে।

“উনার অনেক অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। উনি সৎ ছিলেন, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আত্মত্যাগী ছিলেন, দেশপ্রেমিক ছিলেন। উনার মধ্যে রুচির এক অবিস্মরণীয় প্রকাশ ছিল, পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে বেগম জিয়াকে ইন্টারনালাইজ করতে হবে।”

নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, “সেদিন জানাজার বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদী দলের একজন নেতা লক্ষ লক্ষ মানুষকে কথা দিয়েছিলেন যে, তাদের এই রাজনৈতিক দল বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত হবে।

“আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করব তাদের, কথাটা আপনারা রাখার চেষ্টা করবেন। আপনারা এমন কিছু করবেন না, সেদিনের জমায়েত, লক্ষ লক্ষ মানুষ দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলে যে, ‘তিনি মরে বেঁচে গেছেন, তাকে এসব দেখতে হচ্ছে না’। আমি আশা করব, আপনারা যে কথা দিয়েছেন, সেই কথা আপনারা রাখবেন। তার গণতান্ত্রিক আদর্শে চলবার অঙ্গীকার করেছেন। আমি আশা করব, আপনারা সে পথে চলবেন। যাতে মানুষকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে না হয়।”

লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “আমরা সবাই ধরে নিই যে, প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হওয়া একজন রাজনীতিবিদের শেষ গন্তব্য। না, এ কথাটি ঠিক নয়। একজন নেতার শেষ রূপান্তর এটাকে ছাড়িয়ে যায়। এখানে আপনি লিগ্যাল অথরিটি থেকে মোরাল অথরিটিতে পরিণত হবেন।”

“এই চূড়ান্ত রূপান্তরটা মহান ত্যাগ ছাড়া হয় না, এবং খালেদা জিয়ার জীবনটা দেখলেই বোঝা যায়, এটা পুরোটাই ত্যাগ।

উনি অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন। জীবনের শেষ বছরগুলো উনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। জেলে থাকা অবস্থায় অসহনীয় অত্যাচারের মধ্য দিয়ে গেছেন।”

বিনা চিকিৎসায় আওয়ামী লীগের আমলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, “আপনি যদি অন্য তরফ থেকে দেখেন, এটা একটা গ্রেট স্যাক্রিফাইস। আমি মনে করি যে, বিএনপির অনেক নেতা অনেক স্যাক্রিফাইস করেছে, কোনো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া উনার ত্যাগ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এই জায়গাতেই উনি অনন্য।”

ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, “বেগম জিয়া এই জিনিসটা বুঝতে পারতেন। রাজনৈতিক ভুলভ্রান্তি হয়, প্রত্যেক নেতা ভুলভ্রান্তি করেন, তারও নিশ্চয় ভুলভ্রান্তি ছিল। কিন্তু তিনি কখনও এই দেশের সাধারণ মানুষের বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়াননি।”

পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, “বিশ্বের ইতিহাসে যদি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস আমরা দেখি বা আগামী দিনে দেখব, তাতে বাংলাদেশ অধ্যায় বেগম খালেদা জিয়ার ছাড়া সম্পন্ন হবে না। এটা ইতিহাস প্রমাণ করেছে।

“আমরা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে, বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাকে রাজপথে দেখেছি। এবং সেই রাজপথে আমরাও ছিলাম। সমঅধিকারের দাবি দিয়ে আমরা সোচ্চার হয়েছি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পক্ষ থেকে তিনি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বারবার যেখানে অধিকার খর্ব হয়েছে, সেখানে আমরা তার সরল উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি।”

তিনি বলেন, “আমি শুধু বলব, আমরা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বিভিন্ন সময় দেখেছি, কিন্তু পরিশেষে আমরা তার সমাপ্তিটা অত্যন্ত আশাপ্রদ লক্ষ্য করিনি। আজকে আমরা এক নতুন পরিস্থিতিতে আমি একটা কথা শুধু আপনাদের কাছে নিবেদন করতে চাই।

“এবারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামটা যেন আমরা হাতছাড়া না করি। এবং এটাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান নিবেদন, সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। বাংলাদেশের একটি নাগরিকারাও যদি ধর্ম বা অন্য কারণে নিগৃহীত না হয়, এই নতুন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যদি তা নিশ্চিত হয়, আমি মনে করি সেটাই হবে মরহুমার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন।”

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে উনি দুটি নিদর্শন রেখে গেছেন। উনার আগে কোনো সরকার গ্রাম পর্যায়ের যে নেতা আছেন, গ্রামপ্রধান আছেন, মোড়লের মতো আছেন, তাদের পথকে এত গুরুত্ব দেননি, স্বীকৃতি দেননি।

“বেগম জিয়াই দিয়েছিলেন, যখন তিনি সরকার প্রধান ছিলেন। প্রথমবারের মত সেই গ্রামের কারবারির সম্মানী ভাতাকে, তার পদকে স্বীকৃতি দেওয়া। যদিও সেই সম্মানী ভাতার পরিমাণ কম। তথাপি বলব, সেটা যে সেই চার হাজারের অধিক গ্রামের কারবারির ভূমিকা, এখন পাঁচ শতাধিক নারী কারবারি হয়েছে।

এরপর ২০০৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনে পরিবর্তন এনে দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগে অধীনে নেওয়ার কথাও স্মরণ করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা করা মানে দেশে তার ধারা — উনি যে নিদর্শন দেখিয়েছেন, উনি ব্যক্তিগতভাবে যে দেখিয়েছেন, সেটার পথ ধরে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে পারি।”

জিয়াউর রহমানের মতো খালেদার জানাজায়ও মানুষের শোকের পরিস্থিতি একই রকম থাকলেও এখানে পার্থক্য থাকার কথা তুলে ধরে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, “এর মধ্যেও একটা পার্থক্য আছে। জিয়াউর রহমান যখন মারা গিয়েছিলেন, তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তিনি ক্ষমতায় ছিলেন।

“বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন না। কিন্তু তিনি মানুষের হৃদয়ে ছিলেন। এবং হৃদয়ে থাকার কারণেই বেগম খালেদার জানাজায় আমরা মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত কান্না দেখতে পেয়েছি।

তিনি বলেন, “বেগম জিয়া কেন এত জনপ্রিয় ছিলেন? তার একটা কারণ তো অবশ্যই স্বামীর মতোই তার দেশপ্রেম ছিল। আরেকটি কারণ হচ্ছে তার সংগ্রামী জীবন। এই উপমহাদেশের একশ বছরের ইতিহাসে জিয়ার চেয়ে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, এরকম দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

আইসিসিবি’র সভাপতি মাহবুবুর রহমান শোকসভায় বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া পারিবারিক জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, এটা কঠিন সত্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ববোধ, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেকে একজন অদম্য শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

“তিনি এমন সময়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, তখন দেশের পরিবেশ এমন ছিল, সেখানে অনেকটা অটোক্রেসির পর্যায়ে ছিল। সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, বেসরকারি খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করেছিল।”

তিনি বলেন, “১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ছিল। সেই সময় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।

“ব্যবসায়ী সমাজের কাছে গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়, এটি নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, বিনিয়োগ নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার দুই মেয়াদের দেশের অর্থনীতি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে এবং অবকাঠামোর এসব পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সাহায্য করেছে।”

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “জাতির এই সন্ধিক্ষণে যখন তার উপস্থিতি, পরামর্শ, দিকনির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। উনি হয়তো চাইতেন, আজকের এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা আমরা সকলে একত্রিতভাবে, নীতিনিষ্ঠভাবে, দেশমাতৃকার প্রতি আমাদের ভালোবাসা থেকে যৌথভাবে মোকাবেলা করি। উনি হয়তো সেটাই চাইতেন।”

নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে আমলে নেওয়ার চেষ্টা খালেদা জিয়ার থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তিনি নীতি উপদেষ্টাদের শুনতেন, প্রয়োজনে প্রশ্ন করতেন এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতেন।”

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, “এখানে সবাই সমবেত হয়েছি একটা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ সময়ে। এখানে একটা গুলি, একটা লোক নিহত হলে সম্পূর্ণ ১২ তারিখের নির্বাচন বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটা মনে রাখতে হবে। আমরা বিবেকের কথা মানি না, আমরা আবেগের কথামত চলি। সেটা মনে রাখবেন, যে করেই হোক ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন যেন হয়।

“এবং সেজন্য ডক্টর ইউনূস সবাইকে গ্যারান্টি দিচ্ছেন এবং বারবার বলছেন, যে ওই নির্বাচন হবে একটা আনন্দমুখর উৎসবের দিন। আমিও তাই চাই, কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং আপনাদের যেতে হবে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনী সেদিন একটি পজিটিভ বা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন, আমি সেটা আশা করি।”

তিনি বলেন, “ভোট কেন্দ্রগুলো যেন সত্যি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং সপরিবারে আপনারা যান এবং ভোট দিন। আজকের এই শোকসভা অর্থবহ করতে হলে এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে।

“আর সেই শক্তিকে রূপান্তরিত করবেন কীভাবে? ভোট দিয়ে, ভোট কেন্দ্রে গিয়ে। সুতরাং দয়া করে আপনারা ইলেকশন বানচাল হতে দেবেন না, কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সহিংসতার কারণে গোটা জাতির নির্বাচনের আশা নষ্ট করবেন না।”

শফিক রেহমান বলেন, “ম্যাডামের প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই, একটু অন্যভাবে। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কে ছিলেন? তার সবচেয়ে বড় গুণ কি ছিল? অনেক গুণ তার ছিল, তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি সাহসী এবং দেশকে তিনি ভালোবাসেন।”

লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা যদি তার রাজনৈতিক জীবনটাকে ভাগ করি, তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম ভাগটা হচ্ছে ১৯৮২ থেকে নব্বই পর্যন্ত উত্থানপর্ব। যেখানে তিনি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা বিপর্যস্ত রাজনৈতিক দলকে গঠন করেন এবং নেতা হয়ে ওঠেন।

“দ্বিতীয় পর্বটি হচ্ছে, তার সরকার পরিচালনায় ৯১ সাল থেকে দুই মেয়াদে এবং এক মেয়াদে তিনি বিরোধী দলের নেতা। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সেখানে অনেক ভালো কাজ হয়, তার প্রশংসা হয়, অনেক খারাপ কাজ হয়, তার সমালোচনা হয়। এটিই সরকার। ২০০৭ সাল থেকে তার আরেকটি পর্ব, যেখানে তার লড়াই সংগ্রাম এবং তাকে যে ভিক্টিমাইজ করা হয় নানানভাবে, সেই পর্বটা।”

তিনি বলেন, “তার প্রথম দিকের যে উত্থান পর্ব সেখানে কিন্তু তাকে আমরা সবাই জানি, সবাই বলেন যে তিনি উপসহীন নেত্রী। এই অভিধা তার ভাগে জুটেছিল প্রথম পর্বে। আর শেষ পর্বে আমরা দেখলাম, যেটা মৃত্যুর পরে প্রমাণিত হলো যে, তার প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ-ভালোবাসা এবং সহানুভূতি, সেটা হচ্ছে তার সেই ভিক্টিম ইমেজ। এবং মানুষ এই দুটোকে চিরদিন স্মরণ রাখবে।”

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতিতে যোগ দিয়ে সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা পাওয়ার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে রেকর্ড করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমি বলব যে, তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য যেটা আমাদেরকে আকর্ষণ করে, সেটা হচ্ছে এক শব্দে এলিগেন্স, মার্জিত। তাকে সম্মান করতে হয়, তার মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি আছে। তো এই যে এলিগেন্সটা, এটা আমাদের দেশে রাজনীতিতে নাই।

২০২৪ সালের অগাস্টে মুক্ত হওয়ার পর তার ভিডিওবার্তার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে’। এবং এই কথাটা যদি আমরা মনে রাখি, আমাদেরকে সবার আগে যে জিনিসটা শুরু করতে হবে সেটা হচ্ছে, একটা পলিটিক্স অফ রিকনসিলিয়েশন। আমরা চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, জানের বদলে জান—এভাবে তো দশকের বড় দশক পার করছি। কিন্তু এভাবে তো আমরা সামনেই এগোতে পারব না, কোথাও না কোথাও আমাদেরকে এটা শুরু করতে হবে।”

তিনি বলেন, “আমি তাকে নিয়ে একটা বই লিখেছি, তার উৎসর্গপত্রে আমি একটা কথা লিখেছি, সেটা জালালউদ্দিন রুমির একটি উদৃতি তার কবিতা থেকে, ‘অন্যকে আলো দিতে হলে মোমবাতি হতে হয়, নিজেকে পুড়তে হয়’। তো তিনি সেটা তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।”

খালেদার প্রথম সরকারের সময় স্বাধীন সাংবাদিকতার মনোবাসনা নিয়ে তরুণ সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরুর কথা তুলে ধরে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, “আমার সৌভাগ্য যে, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দেখা হয়েছে এবং উনি আমাদের এই স্বাধীন সাংবাদিকতাকে যে কত মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করতেন এবং তার সহনশীল মনোভাব, ভিন্নমত ও সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা আমি স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে আমার মন জয় করেছে, আমার মনে উনার গভীর শ্রদ্ধার জায়গা করে দিয়েছে।

এবং পরবর্তীকালে উনাকে আরও দেখেছি এবং সত্যিকার অর্থে দেশকে ভালোবেসে, দেশের গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রেও উনার অবদানকে আমি স্মরণ করি এবং শ্রদ্ধা জানাই।”

খালেদা জিয়ার শাসনামলে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রতিবন্ধী ভাতা চালুর বিষয় স্মরণ করেন ডিজেবলড পিপলস ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল।

খালেদা জিয়ার বিদেশ নীতি নিয়ে বক্তব্য দেন তার একানব্বই সরকারের সময় পাকিস্তান ও জেনিভায় বাংলাদেশ দূতের দায়িত্ব পালন করা সাবেক কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম।

ট্রান্সকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান বলেন, “মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন আপসহীন, দৃঢ় এবং খুবই মর্যাদাসম্পন্ন। বাংলাদেশের ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী।

“নব্বইয়ের দশকে উনার বাজারমুখী নীতির ফলে বেসরকারি খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতি আসে। ভ্যাট নীতি, আর্থিক খাতের সংস্কার, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং সিকিউরিটিস এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হয়। রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ফলে উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করে। তৈরি পোশাক খাতে উনার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।”

ওষুধ শিল্পে তার অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “১৯৯৪ সালে ঔষুধের মূল্যনীতির ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে গুণগত উন্নয়ন, গবেষণা এবং বিনিয়োগ বেড়েছিল। যার ফলাফল হিসাবে আজ বাংলাদেশ ওষুধে প্রায় শতভাগ আত্মনির্ভরশীল, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ।”

“বেগম খালেদা জিয়া সবসময় বিশ্বাস করতেন, ব্যবসায় হতে হবে নৈতিকতার সাথে। আর উন্নয়ন হতে হবে মূল্যবোধের উপর ভর করে।”

খালেদা জিয়ার শাসনামলে পাবলিক সার্ভিস কমিশন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ বলেন, “খালেদা জিয়া কতটা মেধাকে ধারণ করতেন, উনার তরফ থেকে কোনো সময় কোনো রকমের হস্তক্ষেপ ছিল না, কোনো তালিকা বা কোনো সুপারিশ ছিল না। উনি চেয়েছিলেন মেধার মাধ্যমে নিয়োগ পাবে সবাই।

“এবং এ কারণেই আজকে যারা বিশিষ্ট জায়গায় অবস্থান করছেন, ক্যাডারে সার্ভিসে তারা সবাই ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ যারা সেদিন ছিলেন।”

অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “আমরা চীনের গল্প জানি কিন্তু বাংলাদেশের গল্প কখনো বলি না। বাংলাদেশে তার সময় প্রায় দুই কোটি মানুষ দরিদ্র সীমার থেকে বেরিয়ে এসেছিল। আমরা আজ অর্থনীতিতে শ্বাস নিই, কিন্তু তার সময় রেমিটেন্স আয় বিলিয়ন ডলার ক্রস করেছিল। আজ আমরা খাদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প বলি, কিন্তু তার সময়—স্লোগানে না, কোনো উদযাপনে না—বাংলাদেশের বোরো ধানের যে বিস্মৃতি, আজকে আমরা চালের ক্ষেত্রে ধানের ক্ষেত্রে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প বলি, সেটা তার সময় হয়েছিল।

“যা কথা আমরা অর্থনীতিবিদরাও বলি না, তা হলো তার সময়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছিল। অর্থাৎ তিনি পেয়েছিলেন ভাঙা কৃষিনির্ভর পাটের স্মৃতিতে এক অর্থনীতি, এবং তার সময় বাংলাদেশে শিল্পায়নের যাত্রা শুরু হয়।”