চট্টগ্রাম অভিমুখী ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে লাখো নেতাকর্মী নিয়ে শোডাউন দিল জামায়াত

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৪৫ অপরাহ্ন, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ পালন করেছে। প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বহর নিয়ে ঢাকা থেকে সকাল ৭টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চের যাত্রা শুরু করে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা। এরআগে শনিবার (৫ সেপ্টম্বর) রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়ায়াতরে মাধ্যমে লংমার্চের কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পথে পথে ৯টি স্থানে সমাবেশ করেছেন ১১ দলীয় ঐক্য। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ সকাল ৭টায় ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হয়। সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

লংমার্চের সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন,জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম প্রমুখ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন। তাঁদের অনেকে মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় ঢাকামুখী লেনে যান চলাচলে ধীর গতি সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন চলাচলকারীরা। একইভাবে চট্টগ্রামমুখী লেনে লংমার্চের বিশাল গাড়িবহর চলাচল করায় থেমে থেমে যানজট ও ধীর গতি দেখা দেয়। এতে যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া কথা রক্ষা করেনি। তিনি বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি ও প্রতারণা করছে। ওয়াদা দিয়ে তা লঙ্ঘন করছে। জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব। সিফাতকে ছেড়ে দেন, ভালো ভালো ছেড়ে দেন। না ছাড়লে মনে রাখবেন, এক নূর হোসেন, এক ইয়াসমিন, এক ডাক্তার মিলন অনেকের গদি উলটপালট করে দিয়েছিল। কখন যে পচা শামুকে পা কাটবে, কেউ বলতে পারে না’—বলেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

আরও পড়ুন: মানুষ বলছে আর কখনো বিএনপিকে ভোট দেব না: অলি আহমদ

সিফাতের গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতিষ্ঠ ও বিরক্ত হয়ে সিফাত নামের একজন তরুণ কী বলেছে, তাতে বাংলাদেশ উলটপালট হয়ে যাওয়ার মতো করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দলীয় সন্ত্রাসীরা থানায় নিয়ে তাকে নাজেহাল করেছে। ওরে ছেড়ে দেন, ভালো ভালো ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, সিফাতের মুখের ভাষার পক্ষে আমরা নই। কিন্তু যে বিষয়ে সে প্রতিবাদ করেছে, সেই বিষয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রয়োজনে সিফাত হয়ে গর্জন করবে। তিনি আরও বলেন, জনগণ চাঁদাবাজদের জ্বালায় অতিষ্ঠ। দুর্নীতিবাজদের হাতে জনগণের অধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে। গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। কিন্তু গ্যাসের বিল যথারীতি আছে, বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল আছে। পানির সংকট নিয়েও কথা বলা যাবে না। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার নিয়েই ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে নেমেছে। আমরা এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায়ের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতেই এই কর্মসূচি শুরু করেছি। আমাদের কর্মসূচির ওষুধ ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন জায়গায় এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ক্রিয়া হলে মোবারকবাদ। প্রতিক্রিয়া হলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি—জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে জনগণও কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না। তিনি বলেন, আমরা কোনো দল বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর জন্য এই রাস্তায় নামিনি। আমরা নেমেছি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে। জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।

লংমার্চে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকারের মন্ত্রীদের সন্তান, পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের অনেকে দুর্নীতি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। এই সরকারের উপরে বিরক্ত মানুষ মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ছয় মাসে সরকার দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনোটি সরকার রাখতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরও পড়ুন: বাধা এলেও চট্টগ্রামে পৌঁছাবেই লং মার্চ: নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, আল্লাহর ওপর ভরসা করে, জমিনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই ৬ দফা দাবির জন্য বাংলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে ১১ দলীয় ঐক্যের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন সংগ্রাম শুরু হয়েছে। আমরা সরকারকে বলব, আপনারা দাবিগুলো মেনে নেন। যদি দাবি না মানেন, এই ছয়দফা এক দফাতে রূপান্তর হবে, সেটি হলো সরকারের পদত্যাগ।  তিনি বলেন, অনেকে ওদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, আমরা এত টাকার তেল খরচ করে কেন লংমার্চে যাচ্ছি। আমরা আজকে বলব সরকারের গদি নড়ে গেছে। সরকার কি তেল পাচ্ছে? আপনারা সবাই মাঠে থাকবেন। শহীদ ওসমান হাদি ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। তিনি আরও বলেন, এই বৃহত্তর কুমিল্লার মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসা করে। জীবনে কখনও মাথানত করে না। কখনও চাঁদাবাজদের কাছে মাথা নত করবে না।

লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জনগণের বক্তব্য শুনতে হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ বলছে, তারা বর্তমান সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেখানে যাওয়া যায়, সেখানেই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, জায়গা দখল, নেতা-কর্মীদের হয়রানি ও মাদকের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দেশকে ‘জাহান্নামে’ পরিণত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন এলডিপির সভাপতি। তিনি বলেন, মানুষের মুখে মুখে আছে যে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের পতন হবে। তাঁর দাবি, সরকার কিছু করুক বা না করুক, ‘নিজের ভারে নিজেই পড়ে যাবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, জনগণের রায় কার্যকর করে জনদুর্ভোগ কমানোর পদক্ষেপ নিতে সরকার ব্যর্থ হলে জনতার মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। এই মিছিল বাড়তে বাড়তে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত গণজোয়ার তৈরি হবে এবং সেই গণস্রোতে সরকার ভেসে যেতে বাধ্য হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ৭০ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে সরকারের পরিণতি অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনে বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘দখলের পরিকল্পনা’ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আখতার হোসেন বলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি সংস্থা, প্রত্যেকটা জায়গায় সরাসরি দলীয় রাজনীতি করা পদধারী ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি বিএনপির দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তিনি বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তার আগে নির্বাচন কমিশনে বিএনপির দলীয় লোককে বসানোর পেছনে কী উদ্দেশ্য? এতেই স্পষ্ট বোঝা যায়, বাংলাদেশে সামনের নির্বাচনগুলোতে দখলদারিত্ব করার নতুন প্ল্যান শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলে দিতে চাই, এই বাংলাদেশে আর আওয়ামী স্টাইলের একতরফা, রাতের ভোটের কিংবা দখলদারিত্বের নির্বাচন আমরা হতে দেব না। 

ছয় দফা দাবিতে শুরু হওয়া লংমার্চের প্রসঙ্গ তুলে আখতার হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মানুষের মধ্যে এ কর্মসূচির পক্ষে ঐক্য তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, জনতার এই জোয়ার থামানো আর সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের প্রতি যে চক্রান্ত আপনারা চালিয়ে যাচ্ছেন, যে দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, তা থেকে ফিরে আসুন। জনগণের ইচ্ছাকে স্বীকার করে গণঅভ্যুত্থানের অভিপ্রায় অনুযায়ী অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুন। 

১১ দলীয় জোটের শরীক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপির বিরুদ্ধে হত্যা, বাড়ি-জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমাদের দাবি পরিষ্কার। গণভোটের লাইন নিতে হবে। দিতে হবে। না দিতে পারলে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে বিএনপি জালিমের মতো হয়েছে। তারা মানুষ হত্যা করেছে, বাড়ি দখল করছে, জমি দখল করছে। মানুষকে জিম্মি করে কিস্তিতে চাঁদা তোলা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের মানুষ বুঝে গেছে মানুষের ভোটে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকবে না। এ দেশের মানুষের ভয় ভেঙে গেছে। এখন সরকার বলছে, সরকারের পতন হবে কি না। অথচ তারাই এখন পতনের আন্দোলন শুরু করেছে।