চাপাতিসহ তিন ভাড়াটে কিলার আটক, খুনের চুক্তি হয় কাশিমপুর কারাগারে

কিশোরগঞ্জে উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩৪ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫২ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জায়েদুল আলম জাহাঙ্গীরকে বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকাণ্ডের জন্য হামলার পরপরই চিৎকারে এলাকাবাসী ছুটে এলে হামলায় অংশ নেওয়া তিন ভাড়াটে কিলারকে পালানোর সময় আটক করেছে এলাকাবাসী। পরে তাদের পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। খুনিদের নিকট থেকে ব্যবহৃত চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। তিনজনই ভাড়াটিয়া হত্যাকারী দাবি করেছে। তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে এই হত্যায় নিয়োজিত করেছে কারা—এটি নিয়েই তদন্ত করছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। কিশোরগঞ্জের দুর্গম হাওর বেষ্টিত এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজ করলেও হঠাৎ করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কারা কী উদ্দেশ্যে জাহাঙ্গীরকে ভাড়াটিয়া কিলার দিয়ে হত্যা করেছে, এটি এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয়। বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর দীর্ঘ ১৭ বছর প্রভাবশালীদের অত্যাচারে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত হয়ে এক রকম অমানবিক জীবনযাপন করছিলেন। বিএনপি নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর রাস্তায় গাছ কাটার ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতি পদ স্থগিত করে তাকে আটক করা হয়েছিল।

কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বুধবার রাত আনুমানিক ০৯.৪০ ঘটিকার দিকে মিঠামইন থানাধীন মিঠামইন সদর বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাসভবনের সামনে মিঠামইন উপজেলা বিএনপি'র সভাপতি জনাব এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর সঙ্গী হাদিসকে আটককৃত আসামি মো: হেলাল, পিতা- মৃত সুলতান, সাং চালিতাবুনিয়া, থানা- বামনা, জেলা- বরগুনাসহ মোঃ মহিন উদ্দিন ও মোঃ শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন নামীয় আসামি চাপাতি দিয়ে ভিকটিম জাহাঙ্গীর আলম ও সঙ্গী হাদিসকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। জখমপ্রাপ্ত ভিকটিমদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জনাব জাহাঙ্গীর আলম মৃত্যুবরণ করেন।

আরও পড়ুন: মধ্যনগরে ৮২ গ্রামের সম্মিলিতভাবে রথযাত্রা উৎসব পালিত

উক্ত ঘটনায় আসামি ১। মো: হেলাল (২৫), পিতা- মৃত সুলতান, সাং চালিতাবুনিয়া, থানা- বামনা, জেলা- বরগুনা, ২। মোঃ মহিন উদ্দিন (৩২), পিতা-মোঃ নূর হোসেন, মাতা-নুরুন্নাহার, সাং-দুধরাজপুর, পোস্ট-নাগমুদ বাজার, থানা-রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর এবং ৩। মোঃ শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫), পিতা-রহমত উল্লাহ ওরফে খোকন, সাং-মধ্যপাড়া, পোস্ট-নাগমুদ বাজার, থানা-রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুরদেরকে গ্রেপ্তার করে থানা হাজতে আটক রাখা হয়েছে এবং হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। মিঠামইন থানা পুলিশ কর্তৃক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় জাহিদুলের বাগানবাড়ির সামনে তাঁকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা বিএনপির কর্মী হাদিস মিয়া গুরুতর আহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন: কাপাসিয়ায় কৃষক স্মার্ট কার্ড তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু

মিঠামইন উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আবদুল আওয়াল বলেন, গতকাল রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন জাহিদুল আলম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির কর্মী হাদিস মিয়া। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা তিন থেকে চারজন দুর্বৃত্ত তাঁদের পথরোধ করে। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে দুজনকে জখম করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে জাহিদুল আলমকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

আনন্দ বসাক, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

স্থানীয় লোকজন আহত দুজনকে উদ্ধার করে প্রথমে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাঁদের অবস্থার অবনতি হলে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ওই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আনন্দ বসাক বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে জাহিদুল আলমকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করেছে। বাকি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার হোসেন।

এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কী কারণে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

বেড়িবাঁধের কয়েকটি মেহগনি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগে বিএনপিতে জাহিদুল আলমের সব সাংগঠনিক পদ স্থগিত করা হয়। পরে ওই ঘটনায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে আটক করে পুলিশ। মামলায় প্রায় এক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত এই তিন আসামি একাধিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কাশিমপুর কারাগারে আটক ছিল। সম্প্রতি তারা মুক্ত হয়ে আবারও ভাড়াটিয়া হিসেবে হত্যাকাণ্ডের মতো কাজ শুরু করে। জানা যায়, হামলার পরপরই তাদের চিৎকারে এলাকাবাসী দৌড়ে আসে। এ সময় চাপাতি হাতে এক কিলার নদীতে ঝাঁপ মারে। পুলিশও দ্রুত ঘটনাস্থলে চলে আসে। পুলিশের সহায়তায় এলাকাবাসী নদী থেকে তাকে আটক করে চাপাতি উদ্ধার করে। অপর দুই কিলার নৌকাযোগে পালানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে বালিখলা এলাকা থেকে আটক করা হয়। পুলিশ হেফাজতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যা মামলার বাইরের প্রক্রিয়া চলছে।