‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আমদানি

শুল্ক ফাঁকি দিতে আস্ত গাড়ি কেটে আনা হয় কয়েক টুকরোয়

Sanchoy Biswas
আবদুল মোনাফ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ৬:২৫ অপরাহ্ন, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৫ অপরাহ্ন, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আস্ত একটি বিলাসবহুল গাড়ি। কিন্তু কাগজপত্রে সেটি কোনো গাড়ি নয়, ‘ইউজড কার পার্টস’। শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে দামি গাড়িকে তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে ফেলা হচ্ছে। এরপর সেই অংশগুলো আলাদা আলাদা গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করে বন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশে আনার পর বিভিন্ন ওয়ার্কশপ বা নির্ধারিত স্থানে অংশগুলো জোড়া লাগিয়ে আবার তৈরি করা হচ্ছে পুরো গাড়ি। এভাবেই শুল্ক ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে বিলাসবহুল গাড়ি আনার অভিনব কৌশলের তথ্য পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মোংলা বন্দর দিয়ে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বিলাসবহুল গাড়িকে ‘সেমি নকড ডাউন’ বা এসকেডি অবস্থায় আমদানির একটি কৌশল শনাক্ত করা হয়েছে। এতে একটি সম্পূর্ণ গাড়িকে এমনভাবে কয়েকটি বড় অংশে কেটে বা বিচ্ছিন্ন করে আনা হয়, যাতে কাগজপত্রে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হিসেবে দেখানো না হয়। পরে দেশে এনে ওই অংশগুলো পুনরায় সংযোজন করে সচল গাড়িতে রূপ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: গাকৃবিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে যে ধরনের শুল্ক ও কর প্রযোজ্য, গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদা পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে সেখানে শুল্ক কাঠামো ভিন্ন হতে পারে। ফলে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির প্রকৃত মূল্য ও শুল্কযোগ্য পণ্য আড়াল করে কম শুল্কে পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়েই একটি গাড়িকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

তবে বিষয়টি কেবল শুল্কের হিসাব কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না, তা নিয়েও তদন্ত করছে সংস্থাটি। কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা দেখছেন, আমদানির সময় পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না, আমদানিকারক প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কোনো তথ্য গোপন করেছেন কি না কিংবা পুরো প্রক্রিয়ায় চোরাচালান বা দলিল জালিয়াতির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।

আরও পড়ুন: রংপুরে চার খুনের আলামত ধুয়েমুছে ফেলা হয়নি: পুলিশ কমিশনার

এমন একটি কৌশলের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ থেকে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি আটকের ঘটনা সামনে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরের জামালখান ওয়ার্ডের রহমতগঞ্জের সাত্তার মঞ্জিলের (বিটিআই ভবন) পার্কিং থেকে গাড়িটি আটক করে সিআইআইডি। গাড়িটি চট্টগ্রাম বিআরটিএর চট্ট মেট্রো-গ-১১-৩৬৫১ নম্বরে চলাচল করছিল। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গাড়িটির আনুমানিক মূল্য আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গাড়িটি শনাক্ত করা হয়। গাড়িটির বর্তমান মালিক মোহাম্মদ আইয়ুবের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। পরে তার স্ত্রী সুলতানা ফারহানা জাহানের কাছে গাড়ি কেনা ও আমদানিসংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান কর্মকর্তারা। কিন্তু তিনি কোনো নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি।

কর্মকর্তারা গাড়িটির চাবি চাইলে সংশ্লিষ্টরা তা দিতেও অস্বীকৃতি জানান বলে জানান রেজভী আহম্মেদ। পরে গাড়ি আমদানির বৈধ দলিল, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করতে না পারায় বিএমডব্লিউটি আটক করা হয়।

কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা বলছেন, মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা করা পণ্য দেশে প্রবেশের পর কীভাবে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে পরিণত হচ্ছে, সেটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি গাড়িকে যদি তিন-চারটি বড় অংশে কেটে আনা হয়, তাহলে আমদানির নথিতে প্রতিটি অংশের পরিচয় কী দেওয়া হয়েছে, পণ্যের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বন্দর থেকে কোন শুল্ক কাঠামোর আওতায় সেগুলো ছাড় করা হয়েছে, এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ইঞ্জিন, বডি, চেসিস, অভ্যন্তরীণ সরঞ্জামসহ গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাদা করে আনার পর সেগুলো একই গাড়ির অংশ কি না, নাকি পৃথক ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত আমদানি পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এরপর দেশে আনার পর সেগুলো কোথায় এবং কার মাধ্যমে সংযোজন করা হয়েছে, সেই তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকলে এতে শুধু শুল্ক ফাঁকির আশঙ্কাই তৈরি হয় না, আমদানির প্রকৃত তথ্য আড়াল করার সুযোগও তৈরি হয়। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে ঘোষিত পণ্য ও দেশে আসা প্রকৃত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহার বাড়লেও এসব গাড়ি বৈধভাবে কী প্রক্রিয়ায় দেশে আসছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে মোংলা বন্দর দিয়ে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণায় আসা পণ্যগুলোর নথিপত্র, আমদানিকারক, চালান ও পরবর্তী গন্তব্যের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিআইআইডির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ বলেন, শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা, ভিন্ন পদ্ধতিতে চোরাচালান কিংবা দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে বিএমডব্লিউ গাড়িটি দেশে আনা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার এই অনুসন্ধান শেষ হলে ‘ইউজড কার পার্টস’-এর আড়ালে আসলে কতগুলো পূর্ণাঙ্গ বা প্রায় পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল গাড়ি দেশে এসেছে, সেগুলো কীভাবে বন্দর থেকে ছাড় করা হয়েছে এবং এতে সরকারের রাজস্ব কতটা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।