জীবিত হয়েও মৃত, স্বীকৃতির আশায় ৯ বছর ঘুরছেন আবুল কাসেম
বয়স ৭০ পেরিয়েছে। নিয়মিত মসজিদে নামাজ পড়েন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ান। অথচ সরকারি নথিতে তিনি মৃত! জীবিত থেকেও মৃতের পরিচয় বয়ে বেড়ানো গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার আবুল কাশেম গত নয় বছর ধরে নিজের জীবিত থাকার স্বীকৃতি পেতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন। বন্ধ হয়ে গেছে বয়স্ক ভাতাও। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর আকুতি, ৯ বছর ঘুরেছি, আর কত দিন ঘুরলে জীবিত হইমু? আবুল কাশেমের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত মাঈন উদ্দিনের ছেলে।
তাঁর অভিযোগ, সরকারি নথিতে মৃত দেখানোর কারণে একদিকে যেমন জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় পড়েছেন, অন্যদিকে হারিয়েছেন বয়স্ক ভাতার মতো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা। বারবার চেষ্টা করেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় এখন তিনি অসহায়।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বিষয়ক প্রেস কনফারেন্স
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে প্রথম জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। পরে উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, ২০১৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের পর তাঁর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরপর থেকেই ভোটার তালিকায় নিজের নাম পুনর্বহাল ও পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধনের চেষ্টা করছেন তিনি।
পরিবারের দাবি, একাধিকবার আবেদন করেও এখন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি।
আরও পড়ুন: নন্দীগ্রাম উপজেলা যুবদল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে মতবিনিময়
সম্প্রতি আবুল কাশেমের বাড়িতে গিয়ে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কয়টা ট্যাহা বয়স্ক ভাতা পাইতাম। হেইডাও বন্ধ কইরা দিছে। আমি নাকি মইরা গেছি! বাঁইচা থাকতেও আমারে মরা দেখাইছে, এইডা কেমনে মাইনা লই? মেম্বার-চেয়ারম্যানের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলি ছিঁড়া গেছে। আর কত দিন ঘুরলে জীবিত হইমু?
স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল ইসলাম বলেন, আবুল কাশেম আমাদের এলাকার বড় ভাই। তিনি সব সময় আমাদের চোখের সামনেই আছেন। আজও একসঙ্গে চা খেয়েছি। কয়েক বছর আগে শুনলাম, তিনি নাকি মারা গেছেন। আমরা কবর দিলাম না, জানাজা পড়লাম না, তাহলে তিনি মারা গেলেন কীভাবে?
যেভাবে নথিতে মৃত হলেন আবুল কাশেম
উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে আবুল কাশেম বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তরিত হন। ওই বছর তাঁকে মৃত উল্লেখ করে আজিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি মৃত্যুসনদের জন্য আবেদন করেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের স্বাক্ষরিত পত্রের ভিত্তিতে আবুল কাশেমকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর ভোটার পরিচয়পত্রের তথ্যও কর্তন করা হয়।
শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. বাহাউদ্দিন বলেন, মৃত হিসেবে নথিভুক্ত থাকায় আবুল কাশেমের বয়স্ক ভাতা স্থগিত করা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি নির্বাচন কার্যালয় সমাধান করবে। পরিচয়পত্রে জীবিত হিসেবে তথ্য সংশোধন হলে আবেদনের মাধ্যমে তাঁকে আবারও বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা যাবে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা তামান্না রশিদ বলেন, আবুল কাশেমের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভোটার এলাকা স্থানান্তরের পর বরিশালের বাবুগঞ্জে তাঁর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে ওই উপজেলার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করতে হবে।
গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, জীবিত একজন মানুষকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী মৃত দেখানো দুঃখজনক।আবুল কাশেমকে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে পাঠানো হলে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় যাচাই করা হবে। জেলা কার্যালয় থেকে সমাধান করা সম্ভব হলে তা করা হবে। অন্যথায় দ্রুত কীভাবে তথ্য সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
নয় বছর ধরে সরকারি দপ্তরে ঘুরেও নিজের জীবিত থাকার স্বীকৃতি পাননি আবুল কাশেম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষের এখন আর দীর্ঘ দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সামলানোর সামর্থ্য কতটুকু, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত তাঁর পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন, ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহাল এবং বয়স্ক ভাতা ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসীর।
জীবিত একজন মানুষকে সরকারি নথিতে মৃত দেখানোর এই জটিলতার দ্রুত নিষ্পত্তি করে আবুল কাশেমকে নাগরিক অধিকার ও প্রাপ্য সরকারি সুবিধা ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।





