মানবিক বাংলাদেশের খোঁজে: নির্বাচন, জনমত ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজনীতি এক দীর্ঘ সময় ধরে আবর্তিত হয়েছে সন্দেহ, শঙ্কা ও পরস্পরবিরোধী আখ্যানের ভেতর দিয়ে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল- কখনো "জঙ্গি তকমা", কখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপ, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ ভয়ের রাজনীতি। তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই পুরোনো আখ্যানগুলো আর আগের মতো কার্যকর থাকছে না- কমপক্ষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।
একসময় ভারতের কৌশলগত বয়ানের সঙ্গে মিল রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াতকে যে দৃষ্টিতে দেখত, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে এখন দৃশ্যমান পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, "জঙ্গি খেতাব" আর আগের মতো অন্ধভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। বরং "ক্লিন ইমেজ", সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রশ্নগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও এই মূল্যায়নগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় রূপ নেয়নি, তবু কূটনৈতিক ভাষা ও আচরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: শীতার্তদের সহযোগিতা দয়ার গল্প নয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যর্থতা
১৯৭১ সালের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল- এমন ব্যাখ্যা বহুদিন ধরেই আলোচনায়। সেই সময় ভারতের নিরাপত্তা-আতঙ্ক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রভাব যে বড় ভূমিকা রেখেছিল, তা আজ অনেক ইতিহাসবিদও স্বীকার করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ভারতের প্রভাববাদী আচরণ এখনো বহু মানুষের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচনে ভারত বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়- এমন ধারণা জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদিও এরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই।
কিন্তু যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো দেশের ভেতরের জনমত। নতুন প্রজন্মের ভোটার ও সাধারণ মানুষ যদি বাধাহীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে জামায়াতের পাল্লা ভারী হতে পারে- এমন ধারণা সমাজের একটি বড় অংশে দৃঢ় হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে সংগঠনের তৃণমূল শক্তি, সামাজিক কাজের উপস্থিতি এবং ‘ভুক্তভোগী রাজনীতি’র বয়ান।
আরও পড়ুন: গ্যাসহীন শহর, গল্পবাজ রাষ্ট্র আর জিম্মি নাগরিক
অন্যদিকে বিএনপির সংস্কার বিষয়ে অনাগ্রহী অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, এই অনীহা গণভোটে ‘না’ ভোটকে শক্তিশালী করার কৌশলের অংশ- যা দলটির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সবচেয়ে সাহসী যে দাবি শোনা যাচ্ছে, তা হলো- যদি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে জামায়াত সরকার গঠন করতে পারে। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, সাধারণ মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশই এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। এই সংখ্যাটি যাচাইযোগ্য না হলেও, এটি যে একটি শক্তিশালী জনঅনুভূতির প্রতিফলন- তা অস্বীকার করা কঠিন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জামায়াত সম্ভাব্য ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্নে একক দলীয় আধিপত্যের বদলে জাতীয় সরকার গঠনের কথা প্রকাশ্যে বলেছে। ডাকসু নেতৃত্ব থেকে একটি প্রস্তাবিত মন্ত্রী পরিষদের খসড়া তালিকাও এই ধারণাকে শক্তিশালী করে- যদিও তালিকাটি এখনো তথ্যসূত্র যাচাইকৃত নয় এবং একে রাজনৈতিক ভাবনার খসড়া হিসেবেই দেখা উচিত।
এই পুরো প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন একটাই- আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
যদি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হয়, তাহলে দরকার প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং সহনশীলতা; দরকার প্রতিপক্ষ দমন নয়, বরং ন্যায্য প্রতিযোগিতা; দরকার বিদেশি প্রভাব নয়, বরং জনগণের রায়। ক্ষমতায় কে আসবে- তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সেই ক্ষমতা যেন আসে জনগণের ভোটে, ভয়মুক্ত পরিবেশে, এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে।
আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি সরকার গঠনের লড়াই নয়- এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণের সুযোগ। এই সুযোগ যদি আমরা মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারি, তাহলেই সত্যিকারের পরিবর্তনের কথা বলা যাবে।
লেখক: এম এফ ইসলাম মিলন, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট।





