কাঁটাতারে ঝুলে থাকা মানবতা ও দক্ষিণ এশিয়ার ‘নতুন নেতানিয়াহু’: চোখে চোখ রেখে জবাব দেওয়ার সময়
বাংলাদেশ-ভারত ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত আজ বিশ্বরাজনীতি ও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক ক্ষতবিস্থত অধ্যায়। যে সীমান্ত হওয়ার কথা ছিল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রতীক, তা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একপেশে ও আগ্রাসী নীতির কারণে পরিণত হয়েছে এক ‘কিলিং জোন’ বা মৃত্যুউপত্যকায়। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকারের বুলি কিংবা প্রতিবেশীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে বিএসএফের বন্দুকের নলের ডগায় আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে মানবতা। এর সাথে একদিকে যেমন যুক্ত হয়েছে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক পুশ-ব্যাক করার নতুন ও উদ্বেগজনক ভারতীয় তৎপরতা, অন্যদিকে তেমনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুসলিম নিধনযজ্ঞ। এই দ্বিমুখী সংকটে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক নিরাপত্তা আজ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
পরিসংখ্যানে সীমান্তে এক রক্তাক্ত অধ্যায় :
আরও পড়ুন: ওয়েস্টমিনস্টার মডেল: গণতন্ত্রের আড়ালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
সীমান্তে বিএসএফের ‘শুট অন সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নীতি দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই নির্মমতার রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট (বিএনপি) সরকারের মেয়াদে এবং পরবর্তীতে চলমান সীমান্ত হত্যাগুলোর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিএসএফ কখনোই তাদের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করেনি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা (যেমন- ‘ResearchGate’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক ডাটা ) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
আরও পড়ুন: সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: দল শুদ্ধির পর এবার প্রশাসনের পালা
২০০১ থেকে ২০০৬ ( বিএনপি-জামায়াত জোট আমল) : ২০০১ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর থেকে বিএসএফের আগ্রাসী টহল ও হত্যাকাণ্ড জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পাঁচ বছরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে শত শত বাংলাদেশী বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যা ২০০৬ সালে সর্বোচ্চ ১৫৫ জনে গিয়ে ঠেকেছিল।
পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী চিত্র : ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে প্রায় ১,০০০ জন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এমনকি বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ে এই সংখ্যা প্রায় ৬০০-এর কাছাকাছি।
বিএসএফ সবসময়ই আত্মরক্ষা বা চোরাচালান দমনের অজুহাতে এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশের কাছেই কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক থাকে না। ফলে, নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই নির্মমতা কোনোভাবেই ‘আত্মরক্ষা’ হতে পারে না, এটি স্পষ্টত ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড।
পুশইনের নামে ভারতের অতি ভাড়াবাড়ি ও রাজনৈতিক চাল
সীমান্তের এই অস্থিতিশীলতার সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘পুশইন’ প্রক্রিয়া। ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাভাষী মুসলিম বা সন্দেহভাজন নাগরিকদের জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটি ভারতের একটি সুদূরপ্রসারী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ, যা তারা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে।
তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের নামে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশের সীমানায় ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো দেশের নাগরিকত্ব বা অনুপ্রবেশের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার কথা। কিন্তু ভারত সেই পথে না হেঁটে পেশীশক্তি ও বন্দুকের নল ব্যবহার করে পুশইন করার যে ‘অতি ভাড়াবাড়ি’ বা বাড়াবাড়ি দেখাচ্ছে, তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।
ভারতের অভ্যন্তরীণ মুসলিম নিধন ও মোদি সরকারের ‘দ্বিমুখী নীতি’
সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার জয়জয়কার এবং তার পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন প্রদেশে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের যে চিত্র উঠে আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গেলো কোরবানির ঈদে ভারতে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ দেখা গেছে। বিভিন্ন রাজ্যে গরু কোরবানিকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী বিজেপি নেতাকর্মী ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো সাধারণ মুসলমানদের ওপর চড়াও হয়েছে। শুধু কোরবানি বা মাংস বহনের ‘অপরাধে’ পিটিয়ে হত্যার (মব লিঞ্চিং) মতো বর্বরোচিত ঘটনাও ঘটেছে। অথচ এই উগ্রতার সমান্তরালে মোদি সরকারের যে অর্থনৈতিক চরিত্র, তা চরম ভণ্ডামিতে ভরা।
বিশ্বের গরুর মাংস (মহিষের মাংসসহ সামগ্রিক বোভাইন মিট) রপ্তানিকারক দেশগুলোর বৈশ্বিক পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে এক চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য বেরিয়ে আসে :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA) এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ। ভারত প্রতি বছর প্রায় ১.৪ থেকে ১.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাংস বিদেশে রপ্তানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ভারতের এই বিশাল মাংস উৎপাদন ও রপ্তানি শিল্পের একটি বড় অংশের সুবিধাভোগী খোদ করপোরেট হিন্দু ব্যবসায়ীরা।
একই রাষ্ট্রে দুই আইন:
দেশের ভেতরে সাধারণ মুসলমান একটি গরু বা মহিষ জবাই করলে তাকে ‘অপরাধী’ সিল মেরে পিটিয়ে মারা হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র নিজে সেই মাংসই প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে পাঠিয়ে মুনাফা লুটছে। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, এটি কোনো ধর্মীয় পবিত্রতার লড়াই নয়; এটি মূলত ভারতের মুসলিমদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ‘মুসলিম নিধন’ বা জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার।
দক্ষিণ এশিয়ায় কি তবে ‘নেতানিয়াহু মডেল’?
ফিলিস্তিনিদের ওপর যেভাবে ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকার বর্ণবাদী ও চরমপন্থী আগ্রাসন চালায়, ঠিক একইভাবে ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করছে। আসামের এনআরসি (NRC), নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং বিভিন্ন রাজ্যে বুলডোজার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে মোদি সরকার যেন নেতানিয়াহুর ‘ইহুদিবাদী’ মডেলের আদলে এক ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাষ্ট্র গঠনে মরিয়া। এই আগ্রাসনের আঁচ স্বভাবতই এসে পড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্তেও।
দিল্লির চোখে চোখ রেখে ঢাকার কড়া জবাবের সময় :
বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় দেশ। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হলো—"সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।" আমরা প্রতিবেশীদের সাথে গায়ে পড়ে কোনো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে চাই না, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা নতজানু হয়ে থাকব। নিজের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এখন ‘চোখে চোখ রেখে’ কথা বলতে হবে।
কূটনৈতিক চ্যানেলে শক্ত অবস্থান : ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, তাদের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তাপ যেন বাংলাদেশের সীমান্তে এসে না পড়ে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা টেবিলে বাংলাদেশকে আর ‘অনুনয়-বিনয়’ করার ভঙ্গিতে নয়, বরং সমান অংশীদার হিসেবে কড়া ভাষায় নিজেদের দাবি ও আপত্তির কথা জানাতে হবে।
সীমান্তে পাল্টা জবাব ও জিরো টলারেন্স : সীমান্তে বিএসএফের একপেশে হত্যাকাণ্ড ও অবৈধ পুশইনের বিরুদ্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) আরও কঠোর ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে হবে। দেশের আকাশসীমা বা স্থল সীমানায় যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের তাৎক্ষণিক শক্ত জবাব দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়া : দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কাজ না হলে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা করার বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (UNHRC) কিংবা প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) মতো বৈভিক প্ল্যাটফর্মে বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে।
উপসংহার
কাঁটাতারের বেড়ায় ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকার দৃশ্য হোক কিংবা গভীর রাতে অথবা দিনের বেলায় কোনো সাধারণ কৃষকের বুকে বিএসএফের বুলেট—এই প্রতিটি ঘটনাই মানবতার মুখে চপেটাঘাত। ভারত আয়তনে বড় বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা কোনো অংশেই কম নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো রাষ্ট্র যদি ‘নেতানিয়াহু’ হয়ে ওঠার খায়েশ প্রকাশ করে, তবে তার পরিণতি এই অঞ্চলের কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব স্বার্থে, নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে ভারতের যেকোনো অন্যায্য ও আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। নতজানু কূটনীতির দিন শেষ, এখন চোখে চোখ রেখে অধিকার আদায়ের সময়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক





