শেকড় থেকে শেখর: ছেঁড়া কাঁথার স্বপ্ন, জাহাজের খবর এবং উন্নয়নের মহাকাব্য
আমাদের সমাজে কিছু প্রবাদ আছে, যেগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এসব প্রবাদের অনেকগুলোই আমরা ব্যবহার করি মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য নয়, বরং নিরুৎসাহিত করার জন্য। "ছেড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে", "আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর নেয়", কিংবা "ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ায়"—এসব কথার মধ্যে প্রায়ই ব্যঙ্গের সুর লুকিয়ে থাকে।
কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর জন্ম হয়েছে ঠিক এই ধরনের ব্যঙ্গ, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ভেতর দিয়েই।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস: বিশ্বশান্তির পথে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত
প্রশ্ন হলো, যদি ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে থাকা মানুষটি লাখ টাকার স্বপ্ন না দেখত, তবে সে কি কখনো লাখ টাকার মালিক হওয়ার চেষ্টা করত? যদি আদার ব্যবসায়ী জাহাজের খবর না নিত, তবে সে কি কখনো বৃহত্তর বাণিজ্যের অংশ হতে পারত? যদি কেউ নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে তাকাতেই না চাইত, তবে উন্নয়ন, উদ্ভাবন কিংবা অগ্রগতি—এসব শব্দেরই কোনো অস্তিত্ব থাকত না।
সত্য হলো, স্বপ্ন সবসময় প্রাচুর্যের ঘরে জন্ম নেয় না; বরং অধিকাংশ সময় তা জন্ম নেয় অভাবের ভেতর। স্বপ্ন হলো বাস্তবতার বিরুদ্ধে মানুষের প্রথম প্রতিবাদ। যে মানুষ আজ সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও বৃহত্তর ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে, আগামী দিনের ইতিহাস অনেক সময় সেই মানুষকেই স্মরণ করে।
আরও পড়ুন: কাঁটাতারে ঝুলে থাকা মানবতা ও দক্ষিণ এশিয়ার ‘নতুন নেতানিয়াহু’: চোখে চোখ রেখে জবাব দেওয়ার সময়
অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল দর্শনও তাই—মাইক্রো থেকে ম্যাক্রোর যাত্রা। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ, বীজ থেকে বৃক্ষ, ঝরনা থেকে নদী, আর নদী থেকে মহাসাগর। পৃথিবীর কোনো মহৎ প্রতিষ্ঠানই জন্মের দিন মহীরুহ ছিল না।
স্টিভ জবসের অ্যাপল শুরু হয়েছিল একটি সাধারণ গ্যারেজ থেকে। জ্যাক মা বহু চাকরিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আলিবাবার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিল গেটসের মাইক্রোসফট শুরু হয়েছিল কয়েকজন তরুণের কল্পনা থেকে। জেফ বেজোসের অ্যামাজন ছিল একসময় একটি ছোট্ট অনলাইন বইয়ের দোকান। আজ তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ।
তাদের সাফল্যের পেছনে মূল শক্তি ছিল পুঁজি নয়; ছিল দৃষ্টিভঙ্গি। তারা নিজেদের বর্তমান অবস্থা দিয়ে ভবিষ্যৎকে বিচার করেননি। তারা দেখেছিলেন সম্ভাবনা, যেখানে অন্যরা দেখেছিল সীমাবদ্ধতা।
এ কারণেই "আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর নেয়"—এই কথাটিকে আমি ব্যঙ্গ নয়, উন্নয়নের ভাষা হিসেবে দেখতে চাই। কারণ জাহাজের খবর না নিলে আদার ব্যবসায়ী কখনো জাহাজের মালিক হওয়ার স্বপ্নও দেখবে না। বৃহৎ অর্থনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য, নতুন প্রযুক্তি কিংবা নতুন জ্ঞানের প্রতি কৌতূহলই উন্নয়নের প্রথম ধাপ।
একইভাবে "ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো" কথাটিও আমরা প্রায়ই বিদ্রূপের অর্থে ব্যবহার করি। অথচ পৃথিবীর বড় বড় সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন এমন মানুষরাই। সমাজসংস্কারক, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক, মানবতাবাদী—তাঁদের অনেকেই ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে জনকল্যাণকে বড় মনে করেছেন। তাঁরা জানতেন, কেবল নিজের জন্য বেঁচে থাকা জীবনকে দীর্ঘ করতে পারে; কিন্তু মানুষের জন্য বেঁচে থাকা জীবনকে অর্থবহ করে।
ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগো এক অমর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন— "যে ধারণার সময় এসে গেছে, তার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু নেই।"
এই কথার মধ্যে ইতিহাসের গভীরতম শিক্ষা নিহিত আছে। একসময় দাসপ্রথা বিলোপের ধারণাকে অবাস্তব বলা হয়েছিল। নারীদের ভোটাধিকারের দাবি নিয়ে উপহাস করা হয়েছিল। মানুষ আকাশে উড়বে—এমন চিন্তাকে পাগলামি মনে করা হয়েছিল। ইন্টারনেট পৃথিবীকে বদলে দেবে—এ ধারণাও একসময় কল্পবিজ্ঞান বলে মনে হয়েছিল।কিন্তু সময় যখন সেই ধারণাগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তখন কোনো শক্তিই সেগুলোকে থামাতে পারেনি।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, "কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত সেটি সবসময়ই অসম্ভব বলে মনে হয়।"
স্টিভ জবস বলেছিলেন, "যারা এতটাই সাহসী যে তারা মনে করে পৃথিবী বদলাতে পারবে, তারাই শেষ পর্যন্ত পৃথিবী বদলায়।"
প্রাচীন চীনা দার্শনিক লাও ৎসু বলেছিলেন, "হাজার মাইলের যাত্রাও শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপ দিয়ে।"
এই তিনটি উক্তি, ভিক্টর হুগোর দর্শনের মতোই, আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বের প্রতিটি বড় পরিবর্তন একসময় ক্ষুদ্র স্বপ্ন হিসেবেই শুরু হয়েছিল।
তাই কেউ যদি বলে, "তুমি ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখছ", তাকে হাসিমুখে বলো—হ্যাঁ, কারণ লাখ টাকার স্বপ্ন সাধারণত লাখ টাকার মানুষ দেখে না; দেখে সেই মানুষ, যে আগামীকালকে আজকের চেয়ে বড় করতে চায়।
কেউ যদি বলে, "আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিচ্ছ", তবে বলো—হ্যাঁ, কারণ জাহাজের খবর না জানলে কোনোদিন জাহাজের দিকেও যাওয়া যায় না। কেউ যদি বলে, "ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়াচ্ছ", তবে বলো—মানুষের জন্য কিছু করার মধ্যেই মানবজীবনের সর্বোচ্চ মহিমা।
প্রকৃতির দিকে তাকালেও আমরা একই শিক্ষা পাই। মহীরুহের জন্ম ক্ষুদ্র বীজে, মহাসাগরের সূচনা ক্ষুদ্র ঝরনায়, সূর্যের আলোও প্রথমে ভোরের ক্ষীণ রেখা হিসেবেই দেখা দেয়। তাই আজ যে মানুষটিকে ছোট মনে হচ্ছে, তার মধ্যেই হয়তো আগামী দিনের নেতৃত্ব, উদ্ভাবন কিংবা জাতীয় জাগরণের বীজ লুকিয়ে আছে।
অতএব, শেকড়কে অবহেলা করো না। কারণ শেকড়ই শেখরের জন্ম দেয়। ব্যঙ্গকে ভয় পেয়ো না। কারণ ইতিহাসের বহু বিজয় একদিন উপহাসের পাত্র ছিল। স্বপ্নকে ছোট কোরো না। কারণ আজকের স্বপ্নই আগামী দিনের বাস্তবতা।
যে জাতি বড় স্বপ্ন দেখতে শেখে, যে জাতি ক্ষুদ্র উদ্যোগকে সম্মান করতে শেখে, যে জাতি ব্যঙ্গের ভেতর থেকেও সম্ভাবনার আলো খুঁজে পায়—সেই জাতিই একদিন উন্নয়নের শিখরে আরোহণ করে।
শেকড়ে থাকো, কিন্তু চোখ রাখো শেখরের দিকে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অনেক সময় ছেঁড়া কাঁথার স্বপ্নই একদিন জাতির ভাগ্য বদলে দেয়।





